শ্রীমঙ্গলের সময়

চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও ফ্রিল্যান্সার-কার রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক?

অর্থনীতি · 2026-10-30T12:01:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও ফ্রিল্যান্সারদের আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। তবে টিআইএন নিবন্ধন, আগের কর নির্ধারণ, নির্দিষ্ট চাকরির পদ কিংবা ব্যবসায়িক ও সরকারি সেবা গ্রহণের শর্তেও রিটার্ন জমা দিতে হতে পারে। ২০২৬–২৭ করবর্ষে সাধারণ ব্যক্তি করদাতাদের জন্য অনলাইন রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক, নির্ধারিত ব্যতিক্রম ছাড়া।

বাংলাদেশে আয়কর রিটার্ন শুধু চাকরিজীবীদের জন্য নয়; ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্যও রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। কারও আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলে রিটার্ন দিতে হয়, আবার কারও আয় সীমার নিচে থাকলেও আইনগত অবস্থান, টিআইএন নিবন্ধন কিংবা নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণের কারণে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হতে পারে।

অনেকেই মনে করেন, শুধু যাঁদের আয় থেকে আয়কর দিতে হয়, তাঁদেরই রিটার্ন জমা দিতে হবে। বাস্তবে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৬ ধারা অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছে কয়েকটি পৃথক শর্তের ভিত্তিতে। তাই চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা ফ্রিল্যান্সার—যে পেশাতেই থাকুন না কেন, নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়ম জানা জরুরি।

চাকরিজীবীদের কার রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক?

চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নির্ভর করে তাঁদের আয়, চাকরির পদ ও অন্যান্য আইনগত শর্তের ওপর। সাধারণত নিচের শ্রেণির চাকরিজীবীদের রিটার্ন জমা দিতে হয়—

যাঁদের বার্ষিক মোট আয় সংশ্লিষ্ট করবর্ষের করমুক্ত আয়ের সীমা অতিক্রম করে, তাঁদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। একইভাবে কোনো ব্যবসা বা পেশায় নির্বাহী কিংবা ব্যবস্থাপনা পদে বেতনভোগী কর্মরত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

কোনো কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক অথবা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী হলেও রিটার্ন জমা দিতে হবে। এ ছাড়া আগের তিন বছরের কোনো এক বছরে কর নির্ধারণ হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে।

তবে সাধারণ কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলে শুধু চাকরি করার কারণে সব ক্ষেত্রে রিটার্ন বাধ্যতামূলক হবে—এমন নয়। তাঁর টিআইএন নিবন্ধন, রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেখানোর প্রয়োজন এবং অন্যান্য আইনগত শর্তও যাচাই করতে হবে।

ব্যবসায়ীদের কার রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক?

ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন দাখিলের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যবসা থেকে আয় করযোগ্য সীমা অতিক্রম করলে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে শুধু আয় বেশি হলেই নয়, ব্যবসার ধরন ও আইনগত অবস্থানের কারণেও রিটার্ন দাখিলের প্রয়োজন হতে পারে।

যেসব ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হতে পারে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—

  • যাঁদের ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত আয়সহ মোট আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করেছে।

  • যাঁরা কোনো ফার্মের অংশীদার।

  • যাঁরা কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী।

  • যাঁদের টিআইএন বা করদাতা হিসেবে নিবন্ধন রয়েছে এবং আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিল করতে হয়।

  • যাঁদের নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক কার্যক্রম, লাইসেন্স, নিবন্ধন বা সেবা গ্রহণের জন্য রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেখাতে হয়।

উদাহরণ হিসেবে, একজন ব্যবসায়ীর বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলেও তাঁর ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন বা নির্দিষ্ট কোনো নিবন্ধন ও সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আয় কম হলেও রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।

তবে ব্যবসার ধরন, প্রতিষ্ঠানের কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট সেবার শর্ত অনুযায়ী নিয়ম আলাদা হতে পারে। তাই সব ব্যবসায়ীর জন্য একই শর্ত ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

ফ্রিল্যান্সারদের কি আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয়?

বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সারদের আয়ও আয়কর আইনের আওতায় আসতে পারে। অনলাইনে কাজ করে বিদেশি বা দেশীয় ক্লায়েন্টের কাছ থেকে অর্থ উপার্জন করলেই কেউ আয়কর রিটার্নের বাধ্যবাধকতার বাইরে থাকেন না।

একজন ফ্রিল্যান্সারের রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হতে পারে কয়েকটি পরিস্থিতিতে।

প্রথমত, আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলে: ফ্রিল্যান্সিং থেকে আয়সহ তাঁর সব উৎসের মোট আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলে রিটার্ন জমা দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, টিআইএন নিবন্ধন থাকলে: আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৬ ধারায় করদাতা হিসেবে নিবন্ধিত ব্যক্তির রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে। তাই ফ্রিল্যান্সারের টিআইএন থাকলে তাঁর ক্ষেত্রে রিটার্ন জমার নিয়ম যাচাই করা জরুরি।

তৃতীয়ত, নির্দিষ্ট সেবা বা সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে: কোনো ব্যাংকিং, ব্যবসায়িক বা সরকারি সেবা গ্রহণের জন্য আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ফ্রিল্যান্সারকেও রিটার্ন জমা দিতে হতে পারে।

ফ্রিল্যান্সারদের আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—বিদেশি ক্লায়েন্টের কাছ থেকে ডলারে অর্থ পাওয়া মানেই সেই অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত নয়। আয়ের প্রকৃতি, সেবার ধরন এবং সংশ্লিষ্ট করবর্ষে কার্যকর কর অব্যাহতির শর্ত অনুযায়ী করের বিষয়টি নির্ধারিত হবে। কোনো নির্দিষ্ট সেবার আয় কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত হলেও রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আলাদাভাবে থাকতে পারে।

আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলেও কার রিটার্ন দিতে হতে পারে?

শুধু চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী বা ফ্রিল্যান্সার নন, আরও কিছু কারণে কোনো ব্যক্তির রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হতে পারে। যেমন—

  • আগের তিন বছরের কোনো এক বছরে তাঁর কর নির্ধারণ হয়ে থাকলে।

  • তিনি কোনো ফার্মের অংশীদার হলে।

  • তিনি কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী হলে।

  • তিনি সরকারি কর্মচারী হলে।

  • কোনো ব্যবসা বা পেশায় নির্বাহী বা ব্যবস্থাপনা পদে বেতনভোগী কর্মী হলে।

  • তাঁর করদাতা হিসেবে টিআইএন নিবন্ধন থাকলে।

  • আয়কর আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোনো সেবা বা কার্যক্রমের জন্য রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেখানো বাধ্যতামূলক হলে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং আয়কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এক নয়। কারও রিটার্ন জমা দিতে হলেও হিসাব অনুযায়ী তাঁর কোনো কর প্রদেয় নাও থাকতে পারে।

২০২৬–২৭ করবর্ষে অনলাইনে রিটার্ন জমা কি বাধ্যতামূলক?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ করবর্ষে সব স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার জন্য অনলাইনে ই-রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। তবে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ করদাতা, শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতা, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতা এবং মৃত করদাতার আইনগত প্রতিনিধি নির্দিষ্ট শর্তে এই বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাবেন। তাঁরা চাইলে অনলাইনেও রিটার্ন জমা দিতে পারবেন।

অর্থাৎ, যাঁদের রিটার্ন দেওয়া আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক, তাঁদের ক্ষেত্রে অনলাইনে জমা দেওয়ার নিয়মও প্রযোজ্য হবে, যদি তাঁরা নির্ধারিত ব্যতিক্রমের মধ্যে না পড়েন।

কীভাবে বুঝবেন আপনার রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক কি না?

নিজের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা যাচাই করতে কয়েকটি বিষয় খেয়াল করুন।

প্রথমে আপনার বার্ষিক মোট আয় হিসাব করুন। শুধু বেতন বা ব্যবসার আয় নয়, প্রযোজ্য সব উৎসের আয় বিবেচনায় নিতে হবে। এরপর আপনার টিআইএন রয়েছে কি না, আগের তিন বছরে কর নির্ধারণ হয়েছে কি না এবং চাকরি বা ব্যবসার পদ ও কাঠামোর কারণে রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক কি না, তা যাচাই করুন।

এ ছাড়া কোনো ব্যাংক, সরকারি দপ্তর, লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট সেবা নিতে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ প্রয়োজন হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করুন।

আইনগত শর্ত পূরণ হলে ই-রিটার্ন পোর্টালে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। অনলাইনে রিটার্ন জমার জন্য ব্যবহার করুন: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন পোর্টাল।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

প্রশ্ন: বেসরকারি চাকরিজীবীর আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলে কি রিটার্ন দিতে হবে?

উত্তর: শুধু বেসরকারি চাকরি করার কারণে সব ক্ষেত্রে রিটার্ন বাধ্যতামূলক নয়। তবে টিআইএন নিবন্ধন, আগের কর নির্ধারণ, নির্দিষ্ট পদে চাকরি কিংবা অন্য কোনো আইনগত শর্ত থাকলে রিটার্ন জমা দিতে হতে পারে।

প্রশ্ন: ছোট ব্যবসায়ীর আয় কম হলে কি রিটার্ন দিতে হবে?

উত্তর: আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলেও টিআইএন নিবন্ধন বা নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। তাই ব্যক্তির পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়ম যাচাই করতে হবে।

প্রশ্ন: ফ্রিল্যান্সারদের কি আলাদা কোনো আয়কর রিটার্ন ফরম রয়েছে?

উত্তর: সাধারণভাবে ফ্রিল্যান্সাররা ব্যক্তি করদাতার রিটার্নে তাঁদের আয় সংশ্লিষ্ট খাতে দেখান। এনবিআরের ই-রিটার্ন ব্যবস্থায় পেশাগত বা ব্যবসায়িক আয়ের প্রকৃতি অনুযায়ী সঠিক খাত নির্বাচন করতে হয়।

প্রশ্ন: টিআইএন থাকলে কি রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক?

উত্তর: আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৬ ধারায় করদাতা হিসেবে নিবন্ধিত ব্যক্তির রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে টিআইএন বাতিল বা স্থগিত করার যোগ্যতা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলে আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে।

প্রশ্ন: রিটার্ন জমা না দিলে কী সমস্যা হতে পারে?

উত্তর: আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানাসহ অন্যান্য আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু সেবা গ্রহণেও রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ প্রয়োজন হতে পারে।

শেষ কথা

চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা ফ্রিল্যান্সার—যে পেশাতেই থাকুন না কেন, আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আপনার আয়, টিআইএন নিবন্ধন, পেশাগত অবস্থান এবং আইনগত শর্তের ওপর নির্ভর করে। শুধু আয় করমুক্ত সীমার নিচে বলে রিটার্নের প্রয়োজন নেই, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। আবার রিটার্ন জমা দিতে হবে মানেই কর পরিশোধ করতে হবে, এমনটিও নয়। তাই নিজের অবস্থান যাচাই করে নির্ধারিত নিয়মে রিটার্ন জমা দেওয়াই নিরাপদ।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত