দোয়া করার সময় হাত তোলা কি সব ক্ষেত্রে জরুরি?
ধর্ম · 2026-10-26T00:55:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
দোয়ার সময় হাত তোলা অনেক ক্ষেত্রে সুন্নাহসম্মত ও উত্তম আদব, কিন্তু সব দোয়ায় এটি বাধ্যতামূলক নয়। নামাজের ভেতরে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হয়, আর ফরজ নামাজের পর নিয়মিত হাত তুলে মোনাজাতের বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এ বিষয়ে মতভেদকে কেন্দ্র করে অন্য মুসলমানকে দোষারোপ না করে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান অনুসরণ করা উচিত।
আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন তুলে ধরা, ক্ষমা চাওয়া এবং কল্যাণ কামনা করা একজন মুসলমানের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেকেই দোয়া করার সময় দুই হাত তুলে মোনাজাত করেন। আবার কেউ কেউ হাত না তুলেই দোয়া করেন। এ অবস্থায় প্রশ্ন আসে, দোয়া করার সময় হাত তোলা কি বাধ্যতামূলক? হাত না তুললে কি দোয়া কবুল হয় না?
ইসলামের শিক্ষা হলো, দোয়া করার সময় হাত তোলা অনেক ক্ষেত্রে সুন্নাহসম্মত ও উত্তম আদব। তবে সব দোয়ার ক্ষেত্রে হাত তোলা জরুরি নয়। দোয়ার ধরন, স্থান এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণীয় পদ্ধতি বিবেচনা করতে হয়। হাত না তুললেই দোয়া হবে না কিংবা দোয়া কবুল হবে না—এমন ধারণারও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই।
দোয়ার সময় হাত তোলার পক্ষে হাদিসে প্রমাণ রয়েছে। সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত লজ্জাশীল ও দানশীল। কোনো বান্দা তাঁর কাছে দুই হাত তুললে তিনি তা শূন্য ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন। হাদিসটি সুনান আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে (হাদিস ১৪৮৮); আলেমরা এর গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এ বর্ণনা সাধারণ দোয়ার সময় হাত তোলার মর্যাদা বোঝাতে উল্লেখ করা হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, হাত তুললেই প্রত্যেকটি প্রার্থনা ঠিক চাওয়া অনুযায়ী এবং সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হবে।
ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, বিপদ থেকে মুক্তি চাওয়া, সুস্থতা কামনা করা কিংবা পরিবারের কল্যাণের জন্য দোয়া করার সময় হাত তোলা যায়। এ ধরনের সাধারণ দোয়ায় হাত তোলা বিনয় ও আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন প্রকাশের একটি মাধ্যম। তবে হাত তোলাকে দোয়া কবুলের অপরিহার্য শর্ত মনে করা উচিত নয়। কেউ হাত না তুলে আন্তরিকভাবে দোয়া করলেও তা দোয়াই।
তবে নামাজের ভেতরে দোয়া করার নিয়ম আলাদা। নামাজের বিভিন্ন অবস্থানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া রয়েছে। সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সিজদার মধ্যে সাধারণ দোয়া করার জন্য আলাদাভাবে দুই হাত তুলে নেওয়া নামাজের নিয়ম নয়। একইভাবে রুকু, দুই সিজদার মধ্যবর্তী বসা কিংবা নামাজের অন্য নির্ধারিত অবস্থানে নিজের ইচ্ছামতো হাত তুলে মোনাজাত করার নিয়ম নেই। নামাজের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর পর হাত তুলে দোয়া করার বিষয়টি নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কিছু আলেমের মতে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের কাছ থেকে প্রতিটি ফরজ নামাজের পর নিয়মিতভাবে হাত তুলে সম্মিলিত মোনাজাত করার সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। অন্যদিকে অনেক আলেম সাধারণ দোয়ার দলিলের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হাত তুলে দোয়াকে বৈধ মনে করেন। তাই এ বিষয়ে মতভেদকে কেন্দ্র করে কাউকে দোষারোপ করা উচিত নয়। নামাজের পর প্রমাণিত জিকির ও দোয়াগুলো পড়া এবং নিজের প্রয়োজন আল্লাহর কাছে তুলে ধরা যায়। নিজের অনুসৃত মাজহাব অনুযায়ী বিস্তারিত জানতে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
জুমার খুতবার সময়ও বিশেষ নিয়ম রয়েছে। ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় মুসল্লিদের মনোযোগ দিয়ে শোনা উচিত। সাধারণ খুতবার দোয়ার সময় নিয়ম করে সবাই হাত তুলে ফেলাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ বলে দাবি করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। তবে বৃষ্টির জন্য বিশেষ দোয়া বা ইস্তিসকার পরিস্থিতিতে নবীজি (সা.)-এর হাত তোলার বর্ণনা রয়েছে। অর্থাৎ, সব পরিস্থিতির বিধান এক নয়।
দোয়া করার সময় শুধু হাত তোলার দিকে মনোযোগ না দিয়ে দোয়ার অর্থ, আন্তরিকতা এবং নিজের আচরণের দিকেও খেয়াল রাখা জরুরি। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, অন্যের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা একজন মুসলমানের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। দোয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গভঙ্গিকেই এমন শর্ত বানানো উচিত নয়, যা শরিয়তে বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
সুতরাং, সাধারণ দোয়ার সময় হাত তোলা উত্তম আদব ও সুন্নাহসম্মত আমল হিসেবে বিবেচিত হলেও সব দোয়ায় এটি বাধ্যতামূলক নয়। নামাজের ভেতরে, খুতবার সময় এবং ফরজ নামাজের পর নিয়মিত মোনাজাতের মতো বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান ও আলেমদের মতভেদ রয়েছে। তাই সহিহ জ্ঞান অর্জন করে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা অনুসরণ করে এবং আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর কাছে দোয়া করাই একজন মুসলমানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।