কোন রক্তের গ্রুপে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি, কী বলছে গবেষণা
লাইফস্টাইল · 2026-10-26T02:06:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
‘এ১’ রক্তের উপগোষ্ঠীর সঙ্গে ৬০ বছরের আগে ইস্কেমিক স্ট্রোকের তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির সম্পর্ক পেয়েছেন গবেষকেরা। অন্যদিকে, ‘ও১’ উপগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈশিষ্ট্যে ঝুঁকি কম দেখা গেছে। তবে রক্তের গ্রুপ একাই স্ট্রোকের ঝুঁকি নির্ধারণ করে না।
রক্তের গ্রুপের সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। ২০২২ সালে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী Neurology-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ৬০ বছর বয়সের আগে ইস্কেমিক স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকির সম্পর্ক থাকতে পারে। বিশেষ করে ‘এ১’ রক্তের উপগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈশিষ্ট্যে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তবে গবেষণার ফলাফলকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না যে ‘এ’ রক্তের গ্রুপের সবার স্ট্রোক হবে বা অন্য গ্রুপের মানুষের স্ট্রোকের ঝুঁকি নেই। গবেষকেরা মূলত রক্তের গ্রুপ নির্ধারণে ভূমিকা রাখা জিনের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য এবং কম বয়সে স্ট্রোকের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজেছেন।
গবেষণায় ৪৮টি পৃথক গবেষণার তথ্য একত্র করে বিশ্লেষণ করা হয়। এতে ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সী ১৬ হাজার ৭৩০ জন স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং স্ট্রোক হয়নি এমন ৫ লাখ ৯৯ হাজার ২৩৭ জনের তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। সব মিলিয়ে ৬ লাখ ১৫ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা কম বয়সে স্ট্রোকের সঙ্গে জিনগত বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করেন।
গবেষণায় ABO নামের জিনের দুটি নির্দিষ্ট জিনগত বৈচিত্র্যের সঙ্গে স্ট্রোকের সম্পর্ক পাওয়া যায়। এগুলো ‘এ১’ ও ‘ও১’ রক্তের উপগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশ্লেষণে ‘এ১’ উপগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে ৬০ বছরের আগে ইস্কেমিক স্ট্রোকের আপেক্ষিক ঝুঁকি প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ‘ও১’ উপগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে ঝুঁকি প্রায় ১২ শতাংশ কম দেখা যায়।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। এই শতাংশগুলো গবেষণায় পাওয়া আপেক্ষিক ঝুঁকির পার্থক্য বোঝায়; কোনো ব্যক্তির স্ট্রোক হওয়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা নয়। গবেষণায় জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্ক শনাক্ত করা হয়েছে, কিন্তু শুধু প্রচলিত রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে ব্যক্তির স্ট্রোকের ঝুঁকি নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা যায়—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।
গবেষকেরা আরও দেখেছেন, কম বয়সে স্ট্রোকের ক্ষেত্রে রক্তের গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈশিষ্ট্যের প্রভাব বেশি স্পষ্ট। ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে একই সম্পর্ক তুলনামূলক দুর্বল ছিল। অর্থাৎ কম বয়সে স্ট্রোকের ঝুঁকির সঙ্গে জিনগত বৈশিষ্ট্যের যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে, বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে তা একই মাত্রায় দেখা যায়নি।
এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রক্তনালিতে জমাট বাঁধার প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত ঝুঁকির প্রভাব কম বয়সে স্ট্রোকের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি হতে পারে। রক্ত জমাট বাঁধার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু প্রোটিনও এ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ঠিক কোন জৈবিক প্রক্রিয়ায় ‘এ১’ উপগোষ্ঠীর সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকির সম্পর্ক তৈরি হয়, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
স্ট্রোকের ধরন বুঝতে পারাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ইস্কেমিক স্ট্রোক হয় যখন মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী কোনো রক্তনালি বন্ধ হয়ে যায়। এতে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ কমে যায়। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি, শারীরিক অক্ষমতা কিংবা মৃত্যু হতে পারে। আলোচিত গবেষণাটি মূলত এই ধরনের স্ট্রোকের সঙ্গে জিনগত বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক নিয়ে পরিচালিত হয়েছে। তাই এর ফলাফল সব ধরনের স্ট্রোকের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া উচিত নয়।
গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিভিন্ন জাতিগত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব থাকলেও সব জনগোষ্ঠীর তথ্য সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ফলে বাংলাদেশের মানুষের ক্ষেত্রে এই ফলাফল একই মাত্রায় প্রযোজ্য কি না, তা নিশ্চিত হতে স্থানীয় ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। পাশাপাশি গবেষকেরা আরও বলেছেন, জিনগত বৈশিষ্ট্য ও স্ট্রোকের মধ্যে সম্পর্কের পেছনের নির্দিষ্ট জৈবিক কারণ বুঝতে অতিরিক্ত বিশ্লেষণ দরকার।
বাস্তবে স্ট্রোকের ঝুঁকি নির্ধারণে রক্তের গ্রুপ ছাড়াও অনেক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, হৃদ্রোগ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব পরিচিত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাবার গ্রহণ, ধূমপান পরিহার এবং রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। শুধু ‘এ’ রক্তের গ্রুপের কারণে আতঙ্কিত হওয়া বা নিজে থেকে কোনো পরীক্ষা কিংবা চিকিৎসা শুরু করার প্রয়োজন নেই।
সব মিলিয়ে, ২০২২ সালের গবেষণায় ‘এ১’ উপগোষ্ঠীর সঙ্গে কম বয়সে ইস্কেমিক স্ট্রোকের তুলনামূলক বেশি ঝুঁকি এবং ‘ও১’ উপগোষ্ঠীর সঙ্গে কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এটি একটি জিনগত সম্পর্কের গবেষণা, ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পরীক্ষা নয়। স্ট্রোক প্রতিরোধে রক্তের গ্রুপের চেয়ে সামগ্রিক স্বাস্থ্য, পরিচিত ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়াই বেশি জরুরি।