ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা, গেজেট প্রকাশ করল সরকার
জাতীয় · 2026-10-29T12:42:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার স্বল্পগতির অটোরিকশা বা ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালা জারি করেছে সরকার। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে নিবন্ধন ফি থেকে শুরু করে যানবাহনের গতিসীমা, রুট, পার্কিং ও ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালায় ব্যাটারিচালিত ই-রিকশার নিবন্ধন, চলাচল, নিরাপত্তা ও ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এর লক্ষ্য সিটি করপোরেশন এলাকায় এসব যানবাহনের চলাচল নিয়মের আওতায় আনা। বিধিমালাটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ অনুযায়ী, দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার টাকা। বার্ষিক নবায়ন ফি ৪ হাজার টাকা। চার যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং নবায়ন ফি ৫ হাজার টাকা। সব ধরনের ই-রিকশার ফিটনেস সনদের জন্য দিতে হবে ১ হাজার টাকা।
নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারীকে জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, দুই কপি পাসপোর্ট সাইজের সত্যায়িত ছবি, নিবন্ধন ফি জমার রসিদ এবং নির্ধারিত ফিটনেস সনদ জমা দিতে হবে। আবেদন যাচাই-বাছাই করে সন্তুষ্ট হলে কর্তৃপক্ষ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেবে। আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলে সাত কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করা যাবে।
প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর, নম্বর প্লেট ও বিস্তারিত তথ্যসংবলিত ব্লু-বুক দেওয়া হবে। নিবন্ধনের মেয়াদ থাকবে পাঁচ বছর। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধন নেওয়া যাবে। তবে এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চালানো যাবে না।
বিধিমালায় ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় সর্বোচ্চ গতিসীমা হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার। যানবাহনের আকার অনুযায়ী চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই বা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে। যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা যাবে না। হর্নের শব্দের তীব্রতা ৪০ ডেসিবেলের বেশি রাখা যাবে না।
নতুন নিয়মে ই-রিকশা জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিআরটি করিডোর, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকা সড়ক ও ফুটপাতে চলাচল করতে পারবে না। চালকদের সড়কের বাম লেন অনুসরণ করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম এবং অনিয়ম করে লেন পরিবর্তনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ই-রিকশার রুট নির্ধারণে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে কাজ করবে। সিটি করপোরেশন এলাকাকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে প্রতিটি জোনে ই-রিকশার সংখ্যা, চলাচলের সড়ক ও নির্দিষ্ট রং নির্ধারণ করা হবে। এক জোনে চলাচলের অনুমতি পাওয়া ই-রিকশা অন্য জোনে চলতে পারবে না। পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে বা উপযুক্ত স্থানে প্রয়োজন অনুযায়ী পার্কিং এলাকা নির্ধারণের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিটি ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময় শেষ হলে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের নিবন্ধন ও নম্বর প্লেট বাতিল করতে হবে। প্রতিটি গাড়িতে স্পিডোমিটার বা ওডোমিটার স্থাপন বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য অনুসারে গাড়ির নকশা ও ফিটনেস নিশ্চিত করতে হবে। যান্ত্রিক বা নিরাপত্তাজনিত ত্রুটিযুক্ত এবং নিবন্ধনবিহীন ই-রিকশা সড়কে চালানো যাবে না।
ব্যাটারি চার্জের ক্ষেত্রেও নতুন বিধিমালায় শর্ত দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত ও সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট বা নির্দিষ্ট গ্যারেজে ব্যাটারি চার্জ করতে হবে। চার্জিং অবকাঠামোয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
পরিবেশ সুরক্ষায় পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি খোলা জায়গা, মাটি, জলাশয় কিংবা সাধারণ বর্জ্যে ফেলা বা পোড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নতুন ব্যাটারি বিক্রির সময় বিক্রেতাকে ক্রেতার কাছ থেকে একটি পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ করে অনুমোদিত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ব্যাটারি ভাঙা বা গলানোর কাজও করা যাবে না।
বিধিমালায় ই-রিকশা চালকদের ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা, ব্যাটারি ও যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটলে চালককে তাৎক্ষণিকভাবে গাড়ি থামিয়ে আহত ব্যক্তিদের সহায়তা করতে হবে এবং পুলিশকে জানাতে হবে।
নিবন্ধন ছাড়া ই-রিকশা চালানো, অনুমোদিত গতিসীমা অতিক্রম, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার, মোটর বা কাঠামো পরিবর্তন, নিষিদ্ধ এলাকায় চলাচল, বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো, সিগন্যাল অমান্য এবং দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
এ ছাড়া ই-রিকশার উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ ও প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের সুপারিশ দিতে একটি কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী যাচাই-বাছাইয়ের পর সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে উৎপাদন লাইসেন্স দেওয়া হবে।
নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর জারি করা ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৫’ রহিত করা হয়েছে।