ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের ফাঁদে পড়ছেন অনেকে, আসল নাকি জাল বুঝবেন যেভাবে
জাতীয় · 2026-10-29T13:40:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
জন্ম নিবন্ধন আসল নাকি জাল, তা যাচাই করতে সরকারি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন পোর্টালে নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়। তবে অনলাইনে রেকর্ড না পেলেই সনদ জাল—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়; প্রয়োজনে নিবন্ধকের কার্যালয়ে যাচাই করতে হবে। ভুল তথ্য থাকলে সরকারি নিয়মে সংশোধন এবং ভুয়া সনদ তৈরির প্রস্তাব এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধন সনদ একজন ব্যক্তির জন্মতারিখ, নাম, বাবা-মায়ের পরিচয়সহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সরকারি রেকর্ড। স্কুলে ভর্তি, পাসপোর্ট তৈরি, জাতীয় পরিচয়পত্রের আবেদন, বিয়ে নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে এ নথির প্রয়োজন হতে পারে। ফলে জন্ম নিবন্ধনের তথ্য ভুল হলে বা সনদটি জাল হলে পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের জটিলতায় পড়তে পারেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।
জন্ম নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে প্রতারণার ঝুঁকিও রয়েছে। কেউ কেউ বয়স পরিবর্তন, ভুয়া পরিচয় তৈরি কিংবা অবৈধ সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে জাল সনদ তৈরি বা ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। আবার অনেকে দালালের মাধ্যমে সনদ তৈরি করিয়ে পরে জানতে পারেন, সেটির তথ্য সরকারি ডাটাবেজে নেই। তাই হাতে থাকা জন্ম নিবন্ধন সনদটি আসল কি না, তা যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
জন্ম নিবন্ধনের সত্যতা যাচাই করতে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সরকারি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্য যাচাই ওয়েবসাইট ব্যবহার করা। সেখানে নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে তথ্য অনুসন্ধান করা যায়। তবে অনলাইনে তথ্য না পাওয়া মানেই সনদটি জাল—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন বা নিবন্ধকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করে তথ্য নিশ্চিত করতে হবে।
আসল জন্ম নিবন্ধন চেনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়
জন্ম নিবন্ধন সনদ আসল কি না, তা যাচাই করার ক্ষেত্রে সনদের কাগজ, ছাপা, সিল বা দেখতে সুন্দর হওয়ার চেয়ে সরকারি রেকর্ডে তথ্যের উপস্থিতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জাল সনদেও আসল সনদের মতো কাগজ, লোগো বা ছাপার নকশা নকল করা সম্ভব।
প্রথমে জন্ম নিবন্ধন নম্বর এবং জন্মতারিখ হাতে রাখুন। এরপর সরকারি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্য যাচাই পোর্টালে প্রবেশ করুন। সেখানে নির্ধারিত ঘরে ১৭ সংখ্যার জন্ম নিবন্ধন নম্বর এবং জন্মতারিখ দিতে হবে। জন্মতারিখ সাধারণত বছর-মাস-দিনের নির্ধারিত ফরম্যাটে দিতে হয়।
তথ্য সঠিকভাবে দেওয়ার পর যাচাই সম্পন্ন হলে সরকারি রেকর্ডে থাকা তথ্য দেখা যেতে পারে। সেখানে প্রদর্শিত নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের নামসহ অন্যান্য তথ্য নিজের সনদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। সব তথ্য মিলে গেলে সনদটির সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়।
তবে অনলাইনে তথ্য মিলে গেলেই সনদের প্রতিটি তথ্য আইনগতভাবে নির্ভুল—এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। সরকারি রেকর্ডে ভুল তথ্য থাকলেও তা প্রদর্শিত হতে পারে। তাই কোনো তথ্য ভুল মনে হলে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় যাচাই বা সংশোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন যাচাই করার নিয়ম
জন্ম নিবন্ধন যাচাই করার জন্য আলাদা কোনো দালালের প্রয়োজন নেই। ইন্টারনেট সংযোগ এবং নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ জানা থাকলে নিজেই সরকারি পোর্টালে চেষ্টা করতে পারেন।
প্রথমে মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের ব্রাউজার থেকে সরকারি ওয়েবসাইট https://everify.bdris.gov.bd/ খুলুন। এটি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যালয়ের তথ্য যাচাই সেবা।
এরপর পেজে থাকা Birth Registration Number ঘরে সনদের ১৭ সংখ্যার নিবন্ধন নম্বর লিখুন। কোনো সংখ্যা বাদ পড়েছে কি না, তা ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। এরপর Date of Birth ঘরে সনদে থাকা জন্মতারিখ নির্ধারিত ফরম্যাটে লিখুন।
ওয়েবসাইটে নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য ক্যাপচা বা অন্য কোনো ধাপ দেখানো হলে সেটি সম্পন্ন করুন। তারপর যাচাইয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। তথ্য সঠিক হলে এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ড অনলাইনে পাওয়া গেলে নিবন্ধনের তথ্য প্রদর্শিত হতে পারে।
তথ্য না এলে নম্বর, জন্মতারিখ ও তারিখের ফরম্যাট আবার পরীক্ষা করুন। তারপরও রেকর্ড না পাওয়া গেলে কিছু সময় পর আবার চেষ্টা করতে পারেন। সমস্যাটি থেকে গেলে সনদে উল্লেখিত নিবন্ধন কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন।
মনে রাখবেন, সরকারি পোর্টালে তথ্য যাচাই করার সময় কোনো অচেনা ওয়েবসাইটে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, পাসওয়ার্ড বা অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য দেবেন না। জন্ম নিবন্ধনের তথ্য যাচাইয়ের নামে কেউ টাকা দাবি করলে আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হন।
জন্ম নিবন্ধনের ১৭ সংখ্যার নম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন যাচাই ব্যবস্থায় ১৭ সংখ্যার জন্ম নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করা হয়। সরকারি যাচাই পোর্টালেও এই নম্বর চাওয়া হয়। তাই সনদে থাকা নম্বরটি সম্পূর্ণ এবং সঠিক কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
নম্বরের কোনো সংখ্যা বাদ পড়লে, ভুল লেখা হলে কিংবা জন্মতারিখের সঙ্গে রেকর্ডের তথ্য না মিললে অনলাইনে যাচাই ব্যর্থ হতে পারে। তাই শুধু নম্বরের দৈর্ঘ্য দেখে সনদ আসল বা জাল নির্ধারণ করা যায় না। ১৭ সংখ্যার নম্বর থাকলেই সনদ আসল—এমন নয়; আবার নম্বর লিখতে ভুল হওয়ার কারণেও প্রকৃত রেকর্ড খুঁজে পাওয়া নাও যেতে পারে।
যদি আপনার হাতে পুরোনো জন্ম নিবন্ধন সনদ থাকে এবং তাতে বর্তমান অনলাইন ব্যবস্থার উপযোগী নম্বর না থাকে, তাহলে সরাসরি সনদটি জাল ধরে নেবেন না। সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করে পুরোনো রেকর্ডের অবস্থা ও করণীয় জেনে নিন।
নাম, জন্মতারিখ ও বাবা-মায়ের তথ্য মিলিয়ে দেখুন
জন্ম নিবন্ধন যাচাইয়ের সময় শুধু নিবন্ধন নম্বরের দিকে নজর দিলেই হবে না। সরকারি রেকর্ডে থাকা ব্যক্তিগত তথ্যও সনদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
প্রথমে নিজের নামের বাংলা ও ইংরেজি বানান পরীক্ষা করুন। এরপর জন্মতারিখ, বাবার নাম, মায়ের নাম এবং সনদে থাকা অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখুন। প্রয়োজনে বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গেও তুলনা করা যেতে পারে।
কোনো একটি তথ্যের অমিল দেখলেই সনদটি জাল বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। নামের বানান, তথ্য প্রবেশের ভুল, পুরোনো রেকর্ড বা নিবন্ধনের সময়কার অসংগতির কারণেও পার্থক্য থাকতে পারে। আবার জাল সনদ তৈরির সময়ও এ ধরনের ভুল দেখা যেতে পারে।
তাই তথ্যের অমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের কার্যালয়ে গিয়ে রেকর্ড যাচাই করুন। প্রকৃত তথ্য ভুলভাবে নিবন্ধিত হয়ে থাকলে সরকারি নিয়মে সংশোধনের আবেদন করতে হবে। নিজে থেকে তথ্য পরিবর্তন বা নতুন করে আরেকটি জন্ম নিবন্ধন তৈরি করার চেষ্টা করবেন না।
QR কোড স্ক্যান করলেই কি জন্ম নিবন্ধন আসল বোঝা যায়?
কিছু সরকারি নথিতে QR কোড বা ডিজিটাল যাচাইয়ের সুবিধা থাকতে পারে। তবে শুধু QR কোড থাকলেই একটি জন্ম নিবন্ধন সনদ আসল বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। জাল সনদেও নকল QR কোড বসানো সম্ভব। আবার সব পুরোনো সনদে একই ধরনের QR কোড বা ডিজিটাল যাচাইয়ের সুবিধা নাও থাকতে পারে।
আপনার সনদে QR কোড থাকলে সেটি স্ক্যান করার পর কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, তা খেয়াল করুন। অচেনা বা সন্দেহজনক ওয়েবসাইট খুললে সেখানে ব্যক্তিগত তথ্য দেবেন না। সরকারি ওয়েবসাইটে নিয়ে গেলেও সেখানে প্রদর্শিত তথ্য সনদের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
QR কোড কাজ না করলে বা স্ক্যান করার পর তথ্য না এলে সঙ্গে সঙ্গে সনদটি জাল বলে সিদ্ধান্ত নেবেন না। প্রিন্টের মান, কোডের ক্ষতি, প্রযুক্তিগত সমস্যা বা পুরোনো নথির কারণে এমন হতে পারে। এ অবস্থায় সরকারি তথ্য যাচাই পোর্টাল এবং সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের কার্যালয় ব্যবহার করুন।
অনলাইনে Record Not Found দেখালে কী করবেন?
জন্ম নিবন্ধন যাচাইয়ের সময় অনেকেই Record Not Found বা তথ্য পাওয়া যায়নি—এ ধরনের বার্তা দেখে আতঙ্কিত হন। কিন্তু এ বার্তা একাই প্রমাণ করে না যে সনদটি জাল।
প্রথমে নিবন্ধন নম্বরটি আবার পরীক্ষা করুন। ১৭টি সংখ্যা ঠিকভাবে লেখা হয়েছে কি না এবং কোনো সংখ্যা বাদ পড়েছে কি না, নিশ্চিত করুন। এরপর জন্মতারিখ সঠিক ফরম্যাটে দেওয়া হয়েছে কি না, দেখুন।
তথ্য ঠিক থাকার পরও রেকর্ড না পাওয়া গেলে আবার চেষ্টা করুন। ওয়েবসাইটে সাময়িক সমস্যা থাকলে কিছু সময় পরে যাচাই করা যেতে পারে। পুরোনো নিবন্ধন, রেকর্ড স্থানান্তর বা ডাটাবেজে তথ্যের অসংগতির মতো বিষয়ও যাচাইয়ের প্রয়োজন তৈরি করতে পারে।
এরপর সনদে উল্লেখিত ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন বা সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন। সনদের কপি এবং আপনার কাছে থাকা প্রাসঙ্গিক তথ্য দেখিয়ে সরকারি রেকর্ড অনুসন্ধানের অনুরোধ করুন।
কর্তৃপক্ষ যদি রেকর্ড খুঁজে না পায় বা সনদ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে, তাহলে তাদের কাছ থেকে পরবর্তী করণীয় জেনে নিন। প্রয়োজন হলে লিখিতভাবে আবেদন বা অভিযোগ করুন। যাচাই শেষ হওয়ার আগে শুধু অনলাইন ফলাফলের ভিত্তিতে কাউকে জাল সনদ ব্যবহারকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা উচিত নয়।
ভুয়া জন্ম নিবন্ধন তৈরির প্রতারণা থেকে বাঁচবেন যেভাবে
জন্ম নিবন্ধন তৈরি, সংশোধন বা পুনর্মুদ্রণের প্রয়োজন হলে সরাসরি সরকারি পোর্টাল ও অনুমোদিত নিবন্ধকের কার্যালয়ের মাধ্যমে কাজ করা নিরাপদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়হীন ব্যক্তি বা অনানুষ্ঠানিক পেজের মাধ্যমে সনদ তৈরির প্রস্তাব এলে সতর্ক থাকুন।
কেউ যদি বলে, কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই জন্মতারিখ পরিবর্তন করে দেবে, পুরোনো রেকর্ড মুছে নতুন নিবন্ধন করে দেবে অথবা অল্প সময়ে নিশ্চিতভাবে সরকারি সনদ তৈরি করে দেবে, তাহলে তার দাবির ওপর নির্ভর করবেন না। সরকারি নিবন্ধন ও সংশোধনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে।
সনদ তৈরির জন্য অগ্রিম টাকা পাঠানোর আগে প্রতিষ্ঠানের পরিচয় যাচাই করুন। ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে টাকা পাঠিয়ে সরকারি সনদ পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। অচেনা ব্যক্তিকে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, জন্ম নিবন্ধনের নম্বর, ছবি বা অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে।
জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধনের নামে কেউ অবৈধভাবে বয়স পরিবর্তন বা মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রস্তাব দিলে তা গ্রহণ করবেন না। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই নিরাপদ।
জন্ম নিবন্ধনে ভুল থাকলে কীভাবে সংশোধন করবেন?
জন্ম নিবন্ধনের তথ্য ভুল থাকলে জাল সনদ তৈরির পরিবর্তে সরকারি নিয়মে সংশোধনের আবেদন করতে হবে। বাংলাদেশের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনসংক্রান্ত সরকারি পোর্টালে জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধনের ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রথমে সরকারি ওয়েবসাইট https://bdris.gov.bd/ খুলুন। সেখানে জন্ম নিবন্ধন তথ্য সংশোধনের অপশন নির্বাচন করে নির্দেশনা অনুসরণ করুন। সংশোধনের জন্য জন্ম নিবন্ধন নম্বর, জন্মতারিখ এবং সংশোধন করতে চাওয়া তথ্য দিতে হতে পারে। ভুল তথ্যের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, নামের বানান সংশোধন করতে হলে সঠিক নামের সমর্থনে গ্রহণযোগ্য নথি লাগতে পারে। বাবা-মায়ের নাম সংশোধনের ক্ষেত্রে তাদের জন্ম নিবন্ধন বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথির তথ্যও প্রয়োজন হতে পারে। কোন নথি লাগবে, তা সংশোধনের ধরন ও কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে।
অনলাইনে আবেদন করার পর আবেদনপত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হতে পারে। আবেদন জমা দিলেই সংশোধন নিশ্চিত হয়ে যায় না; কর্তৃপক্ষ তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয়।
যদি জন্ম নিবন্ধনে ভুল তথ্য দেওয়া হয়ে থাকে বা মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে সনদ তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে নিজে থেকে নতুন আরেকটি নিবন্ধন তৈরি করবেন না। সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের কার্যালয়ে বিষয়টি জানিয়ে আইনসম্মতভাবে সংশোধন বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা নিন।
ভুয়া জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করলে কী আইনি ঝুঁকি হতে পারে?
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪-এ মিথ্যা তথ্য দেওয়ার বিষয়ে শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনের ২১ ধারার বিধান অনুযায়ী, জন্ম বা মৃত্যু নিবন্ধনের জন্য মিথ্যা তথ্য দেওয়া কিংবা জেনেশুনে মিথ্যা লিখিত বিবরণ বা ঘোষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। <Cite refs={["turn234283search1","turn234283search3"]}/>
তবে কোনো ব্যক্তির সনদে ভুল পাওয়া গেলেই তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে জালিয়াতি করেছেন—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ভুল তথ্য, অনিচ্ছাকৃত অসংগতি এবং জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার বিষয়গুলো এক নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
জাল বা ভুল তথ্যযুক্ত নথি ব্যবহার করলে পাসপোর্ট, শিক্ষা, চাকরি বা অন্যান্য সরকারি সেবা গ্রহণের সময় সমস্যা হতে পারে। তাই কোনো তথ্য ভুল থাকলে সেটি গোপন না করে বৈধ প্রক্রিয়ায় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
ভুয়া জন্ম নিবন্ধন শনাক্ত হলে কোথায় অভিযোগ করবেন?
আপনার নিজের জন্ম নিবন্ধন বা অন্য কোনো সনদ সম্পর্কে সন্দেহ হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন। সনদটি কোথা থেকে ইস্যু করা হয়েছে, সরকারি রেকর্ডে তথ্য আছে কি না এবং কীভাবে যাচাই করা যাবে—এসব বিষয়ে জানতে চান।
কেউ টাকা নিয়ে ভুয়া জন্ম নিবন্ধন তৈরি করে দিলে বা সরকারি নথি জাল করার প্রস্তাব দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা যেতে পারে। প্রতারণার শিকার হলে লেনদেনের রসিদ, বার্তা, যোগাযোগের তথ্য ও অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণ করুন। গুরুতর জালিয়াতি বা আর্থিক প্রতারণার ঘটনায় প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিন।
কোনো ব্যক্তির সনদে সন্দেহজনক তথ্য দেখলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ বা প্রকাশ্যে জালিয়াতির অভিযোগ তোলা উচিত নয়। আগে সরকারি যাচাইয়ের মাধ্যমে তথ্য নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোই দায়িত্বশীল পদ্ধতি।
জন্ম নিবন্ধন যাচাই নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
জন্ম নিবন্ধন যাচাই করতে কি টাকা লাগে?
সরকারি অনলাইন তথ্য যাচাই পোর্টাল ব্যবহার করে তথ্য অনুসন্ধানের জন্য নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। যাচাইয়ের নামে কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি টাকা চাইলে সতর্ক থাকুন। সংশোধন, পুনর্মুদ্রণ বা অন্য কোনো সেবার জন্য আলাদা ফি প্রযোজ্য হতে পারে।
১৭ সংখ্যার জন্ম নিবন্ধন নম্বর থাকলেই কি সনদ আসল?
না। ১৭ সংখ্যার নম্বর সরকারি অনলাইন যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও শুধু নম্বরের দৈর্ঘ্য দিয়ে সনদের সত্যতা নিশ্চিত করা যায় না। সরকারি রেকর্ডে তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।
অনলাইনে তথ্য না পেলে কি নতুন জন্ম নিবন্ধন করতে হবে?
না। আগে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করে পুরোনো রেকর্ড অনুসন্ধান করুন। রেকর্ড না পাওয়ার কারণ নিশ্চিত না হয়ে নতুন নিবন্ধনের আবেদন করা উচিত নয়, কারণ একই ব্যক্তির একাধিক নিবন্ধন তৈরি হলে জটিলতা হতে পারে।
সনদে নাম বা জন্মতারিখ ভুল থাকলে কী করব?
সরকারি জন্ম নিবন্ধন পোর্টালের সংশোধন ব্যবস্থা ব্যবহার করুন এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্রসহ সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। সঠিক তথ্যের সমর্থনে নথি জমা দিতে হতে পারে।
QR কোড না থাকলে কি জন্ম নিবন্ধন জাল?
না। শুধু QR কোডের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি দিয়ে সনদের সত্যতা নির্ধারণ করা যায় না। সরকারি ডাটাবেজে তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজনে নিবন্ধকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন।
শেষ কথা
জন্ম নিবন্ধন সনদ আসল নাকি জাল, তা যাচাই করার সবচেয়ে কার্যকর প্রাথমিক উপায় হলো সরকারি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্য যাচাই পোর্টালে নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে তথ্য মিলিয়ে দেখা। পাশাপাশি সনদের নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের নাম ও অন্যান্য তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অনলাইনে রেকর্ড না পাওয়া গেলে তাড়াহুড়া করে সনদটিকে জাল ধরে নেবেন না। নম্বর ও জন্মতারিখ আবার যাচাই করুন এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন। সনদে ভুল থাকলে সরকারি নিয়মে সংশোধন করুন, আর প্রতারণার শিকার হলে প্রমাণ সংরক্ষণ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানান।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জন্ম নিবন্ধন তৈরি বা সংশোধনের জন্য দালাল কিংবা অবৈধ পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করা। সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে জালিয়াতির ঝুঁকি কমবে এবং ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ সেবা গ্রহণের সময় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে।