প্রাথমিকে ৯৩, মাধ্যমিকে ৫৭ শতাংশ বই ছাপা শেষ, নভেম্বরের মধ্যে বই পৌঁছানোর পরিকল্পনা
শিক্ষা · 2026-10-29T13:09:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক্-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরে ৫৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে। অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপায় ধীরগতির কারণে নজরদারি বাড়িয়েছে এনসিটিবি। সরকারের লক্ষ্য ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব উপজেলায় মানসম্মত বই পৌঁছে দেওয়া।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই পৌঁছে দিতে মুদ্রণ ও সরবরাহ কার্যক্রম জোরদার করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। সংস্থাটির ২৮ অক্টোবরের মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক্-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে মিলিয়ে প্রায় ৯৩ শতাংশ বই ছাপার কাজ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তর মিলিয়ে বই মুদ্রণের অগ্রগতি ৫৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের সব শ্রেণির বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত বই সরবরাহ নিশ্চিত করতে ছাপাখানাগুলোর কাজ নিয়মিত তদারকি করছে এনসিটিবি।
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, এবার সারা দেশে ৬২৩টি লটে ১১৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান পাঠ্যবই ছাপার কাজ পেয়েছে। প্রাক্-প্রাথমিক, প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকের বিভিন্ন ধারার জন্য মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১টি বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বইও অন্তর্ভুক্ত।
স্তরভিত্তিক হিসাবে প্রাক্-প্রাথমিক স্তরে ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি বইয়ের মধ্যে ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩টি ছাপা হয়েছে। অর্থাৎ এ স্তরে মুদ্রণ অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ২১ শতাংশ। এর মধ্যে ৫০ লাখ ৭০ হাজার ২৪০টি বইয়ের প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন বা পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে, যা মোট বইয়ের ৮৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬টি বই ছাপানোর কথা রয়েছে। ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ছাপা হয়েছে ৬ কোটি ৬৬ লাখ ২৯ হাজার ১৭৩টি বই। এ হিসাবে মুদ্রণ অগ্রগতি ৮৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ স্তরে ৫ কোটি ৯১ লাখ ১৭ হাজার ৮৮৯টি বইয়ের পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে, যা মোট বইয়ের ৭৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
প্রাক্-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তর মিলিয়ে বই মুদ্রণের গড় অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ফলে এ দুই স্তরের বই ছাপার কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। তবে ছাপা শেষ হওয়া এবং মান যাচাই শেষে উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ সম্পন্ন হওয়া এক বিষয় নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই পৌঁছাতে মুদ্রণের পাশাপাশি পরিদর্শন ও পরিবহন কার্যক্রমও শেষ করতে হবে।
ইবতেদায়ি স্তরের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৪ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৪টি বই ছাপানোর কথা রয়েছে। এর মধ্যে ২ কোটি ৬৭ লাখ ১০ হাজার ৭৮৪টি বই ছাপা হয়েছে। এ স্তরে মুদ্রণ অগ্রগতি ৬৪ দশমিক ১৫ শতাংশ। আর ২ কোটি ১২ লাখ ৮১ হাজার ৪২২টি বইয়ের পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে, যা মোট বইয়ের ৫১ দশমিক ১১ শতাংশ।
অন্যদিকে মাধ্যমিকের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার ১৮টি বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৯ কোটি ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৫৬টি বই ছাপা হয়েছে। এ হিসাবে মাধ্যমিক স্তরে মুদ্রণ অগ্রগতি ৫১ দশমিক ১৮ শতাংশ। এ স্তরে ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫টি বইয়ের পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে, যা মোট বইয়ের ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি।
ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তর মিলিয়ে বই মুদ্রণের গড় অগ্রগতি ৫৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এ দুই স্তরের মধ্যে বিশেষ করে অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপার কাজে ধীরগতির কথা জানিয়েছে এনসিটিবি। কিছু ছাপাখানায় এসব শ্রেণির বইয়ের ফর্মা ছাপা শুরু হলেও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজের অগ্রগতি কম। এ কারণে সংশ্লিষ্ট ছাপাখানাগুলোর কাজের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বাসসকে জানান, প্রাক্-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের বই ছাপার কাজ ৯০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয়েছে। ইবতেদায়ি এবং মাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই ছাপার কাজও অর্ধেকের বেশি এগিয়েছে। তবে অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপার গতি তুলনামূলক কম। কয়েকটি লটে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করায় কাজের অগ্রগতিতে কিছুটা ধীরগতি হয়েছে।
কাজের গতি কম থাকায় ৩২টি ছাপাখানাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রয়োজনে পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ বাতিল করে অন্য ছাপাখানাকে দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে কাজ সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। বইয়ের মান ও নির্ধারিত সময়সীমা ঠিক রাখতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একাধিক দল মাঠপর্যায়ে তদারকি করছে।
বইয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করতেও এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে শিক্ষা প্রশাসন। এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ৫৩টি মনিটরিং টিম বিভিন্ন ছাপাখানায় বইয়ের মান যাচাই করছে। এনসিটিবির মনিটরিং প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানদণ্ড পূরণ না করায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিম্নমানের ফর্মা, ছাপানো বই ও কভার বাতিল করা হয়েছে। প্রতিবেদনের এক অংশে ৩৬টি প্রেসের ৯ লাখ ফর্মা ও ১২ হাজার বই বাতিলের কথা বলা হয়েছে; অন্য অংশে ফর্মার সংখ্যা সাড়ে ৯ লাখ উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বাতিল করা ফর্মার সঠিক সংখ্যা মূল নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু জানান, রোডম্যাপ অনুযায়ী বই সরবরাহের কাজ চলছে। প্রাথমিক স্তরের বইয়ের মুদ্রণকাজ অক্টোবরের মধ্যেই ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশা রয়েছে। আর মাধ্যমিক স্তরের বই ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৯৫ শতাংশের বেশি সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, এবার বই গ্রহণের সময় জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সরাসরি মান যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বই গ্রহণের পর মানে বিচ্যুতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট গ্রহীতা কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, নিম্নমানের কাগজে তৈরি বই উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ করা বরদাশত করা হবে না। নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত বই সরবরাহে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, প্রাক্-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে বই ছাপার কাজ এগিয়ে থাকলেও ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বই ছাপা এবং মান যাচাই বাকি রয়েছে। ফলে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব উপজেলায় শতভাগ বই পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য পূরণে পিছিয়ে থাকা শ্রেণিগুলোর মুদ্রণ ও সরবরাহের গতি বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।