ফিলিস্তিনিরা কি ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন?
বিশ্ব · 2026-10-27T06:54:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর)। গাজা যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার পর এই নির্বাচনকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব এবং দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ইসরায়েলের নির্বাচনে বসবাসকারী সব মানুষের ভোটাধিকার নেই। ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব ও আইনি মর্যাদার ভিত্তিতে এই অধিকার নির্ধারিত হয়।
ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রায় ৭৩ লাখ নাগরিক ভোট দেওয়ার যোগ্য। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইসরায়েলি নাগরিকত্বধারী ফিলিস্তিনি বা আরব নাগরিকরাও। কিন্তু অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না। পূর্ব জেরুজালেমের অধিকাংশ ফিলিস্তিনিরও নেসেট নির্বাচনে ভোটাধিকার নেই, কারণ তাঁদের অধিকাংশের ইসরায়েলি নাগরিকত্বের পরিবর্তে স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা রয়েছে।
ইসরায়েলি নাগরিকত্বধারী ফিলিস্তিনিরা ভোট দিতে পারেন
ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের একটি বড় অংশ নিজেদের ফিলিস্তিনি পরিচয়ে পরিচিত করেন। তাঁদের অনেকে ‘ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি নাগরিক’ হিসেবেও পরিচিত। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। নাগরিকত্বের শর্ত পূরণকারী এবং ভোটার তালিকায় নিবন্ধিত প্রাপ্তবয়স্করা জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন।
ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি কোনো একজন প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচন করেন না; তাঁরা রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। পরে নেসেটের আসনসংখ্যা ও দলগুলোর সমর্থনের ভিত্তিতে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে আরব নাগরিকদের ভোট শুধু তাঁদের নিজস্ব প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণেই নয়, সরকার গঠনের সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিরা কেন ভোট দিতে পারেন না?
অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা সাধারণত ইসরায়েলি নাগরিক নন। তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতা রয়েছে। ফলে ইসরায়েলের নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত নেসেট নির্বাচনে তাঁরা ভোট দিতে পারেন না।
পূর্ব জেরুজালেমের পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। ১৯৬৭ সালের পর সেখানকার অধিকাংশ ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েলি নাগরিকত্বের পরিবর্তে স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা দেওয়া হয়। এই মর্যাদায় তাঁরা নির্দিষ্ট কিছু নাগরিক সুবিধা পান এবং স্থানীয় পৌর নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য হতে পারেন। কিন্তু ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে হলে ইসরায়েলি নাগরিকত্ব প্রয়োজন। যারা নাগরিকত্ব পেয়েছেন এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করেন, তাঁরা ভোট দিতে পারেন।
এই ব্যবস্থার কারণে একই অঞ্চলে বসবাস করলেও মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ভিন্ন হতে পারে। অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি নাগরিক বসতি স্থাপনকারীরা ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন, কিন্তু তাঁদের কাছাকাছি বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি নাগরিক না হলে সেই সুযোগ পান না।
আরব ভোটারদের উপস্থিতি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ইসরায়েলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনী ব্যবস্থায় নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য সাধারণত অন্তত ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর জোট এবং বিরোধী দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কাছাকাছি বলে দেখা গেছে। আরব দলগুলোর সম্ভাব্য আসনসংখ্যাও সরকার গঠনের হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত কয়েকটি জরিপে আরব দলগুলোর জন্য প্রায় ১৪ থেকে ১৬টি আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। তবে এগুলো ছিল নির্বাচনের আগের অনুমান, চূড়ান্ত ফল নয়। আরব দলগুলো কোনো জোট সরকারে সরাসরি অংশ নেবে, নাকি বাইরে থেকে সমর্থন দেবে—সেটিও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ভোটার উপস্থিতি বাড়ার প্রত্যাশা
২০২২ সালের নির্বাচনে ইসরায়েলের আরব ভোটারদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এবার ভোটার উপস্থিতি বাড়তে পারে বলে নির্বাচনের আগে কয়েকটি জরিপে পূর্বাভাস দেওয়া হয়। রয়টার্স ও দ্য টাইমস অব ইসরায়েল-এর ২১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, একটি জরিপে আরব ভোটারদের উপস্থিতি প্রায় ৬৩ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল; ২০২২ সালে তা ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ।
গাজা যুদ্ধ, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আরব জনপদে অপরাধ এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ভোটার উপস্থিতি কত হবে, তা নির্বাচনের ফল ও আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পশ্চিম তীরের ক্রসিং বন্ধের ঘোষণা
নির্বাচনের দিন নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে পশ্চিম তীরের সঙ্গে সব স্থলক্রসিং বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৭ অক্টোবর নির্বাচনের দিন ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের প্রবেশ-নির্গমনেও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার কথা জানিয়েছে ইসরায়েল।
এই ব্যবস্থা ভোটাধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন থেকে আলাদা হলেও অধিকৃত অঞ্চলের ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন চলাচল ও জীবিকার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। ক্রসিং বন্ধের ঘোষণাটি নির্বাচনের দিন নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেওয়া হয়েছে বলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার নির্ভর করে নাগরিকত্ব ও আইনি অবস্থানের ওপর। ইসরায়েলি নাগরিকত্বধারী ফিলিস্তিনিরা ভোট দিতে পারলেও অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিরা এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। পূর্ব জেরুজালেমের অধিকাংশ ফিলিস্তিনিও নাগরিকত্ব না থাকায় জাতীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। ফলে ইসরায়েলের নির্বাচনের ফল তাঁদের জীবন, চলাচল ও নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে, অথচ তাঁরা সেই সরকার নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নিতে পারেন না।
তথ্যসূত্র:আল জাজিরা, রয়টার্স, দ্য টাইমস অব ইসরায়েল ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।