শ্রীমঙ্গলের সময়

সাড়ে ৭ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে রোবটের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার

বিশ্ব · 2026-10-27T06:26:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কিলোমিটার দূরে চীনের সাংহাইয়ে একটি রোবট নিয়ন্ত্রণ করে অস্ত্রোপচারের সফল প্রদর্শনী করেছেন এক চিকিৎসক। অত্যাধুনিক রোবট ও দ্রুতগতির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে কৃত্রিম কিডনিতে কাটাছেঁড়া ও সেলাইয়ের এই পরীক্ষা দূরবর্তী অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে পরীক্ষাটিতে কোনো বাস্তব রোগী ছিলেন না; কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহার করেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সিডনির ক্রিস ওব্রায়েন লাইফহাউসে বসে অস্ত্রোপচারের রোবট নিয়ন্ত্রণ করেন সহযোগী অধ্যাপক রুবেন থানাগাসালম। অন্যদিকে, রোবটটি রাখা হয়েছিল চীনের সাংহাইয়ে। দুই স্থানের মধ্যে দূরত্ব ছিল প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কিলোমিটার।

পরীক্ষায় ব্যবহার করা হয় ‘টুমাই’ (Toumai) নামের একটি রোবটিক সার্জারি ব্যবস্থা। চিকিৎসক সিডনিতে একটি কনসোলে বসে হাতের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পরিচালনা করেন। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী সাংহাইয়ে থাকা রোবটের যন্ত্রাংশ কৃত্রিম কিডনিতে কাটাছেঁড়া ও সেলাইয়ের কাজ করে।

ফাইভ-জি নেটওয়ার্কে নিয়ন্ত্রণ

দূরবর্তী অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজন ছিল দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা। এ পরীক্ষায় ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসকের নির্দেশ সিডনি থেকে সাংহাইয়ে পৌঁছানো এবং রোবটের কার্যক্রমের প্রতিক্রিয়া ফিরে আসার মধ্যে সামান্য সময়ের ব্যবধান ছিল।

রুবেন থানাগাসালম জানান, অস্ত্রোপচারের আগে নেটওয়ার্ক সংযোগ পরীক্ষা করা হয়েছিল। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতির জন্য বিকল্প সংযোগের ব্যবস্থাও রাখা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষার সময় সংযোগের বিলম্ব ছিল প্রায় ১৫০ মিলিসেকেন্ড। এই বিলম্ব থাকা সত্ত্বেও তিনি রোবটের গতিতে এমন কোনো পার্থক্য অনুভব করেননি, যা কাজ পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করেছে।

তবে দূরবর্তী অস্ত্রোপচারে নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে বা বিলম্ব বেড়ে গেলে রোবটের নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ কারণে বাস্তব রোগীর ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে সংযোগের নির্ভরযোগ্যতা, বিকল্প ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

দূরবর্তী এলাকার রোগীদের জন্য সম্ভাবনা

বিশেষজ্ঞদের মতে, দূরনিয়ন্ত্রিত রোবটিক অস্ত্রোপচার ভবিষ্যতে বড় শহরের বাইরে বসবাসকারী রোগীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে পারে। বর্তমানে অনেক রোগী জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য বড় শহর কিংবা বিশেষায়িত হাসপাতালে যেতে বাধ্য হন। দূরবর্তী অস্ত্রোপচার কার্যকরভাবে চালু করা গেলে অভিজ্ঞ চিকিৎসক অন্য শহর বা অঞ্চলে থাকা রোগীর অস্ত্রোপচারে সরাসরি অংশ নিতে পারবেন।

এতে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে—এমন অঞ্চলে উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। দূর থেকে অভিজ্ঞ সার্জনদের তত্ত্বাবধান ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিটি কাজে লাগতে পারে।

তবে সিডনি-সাংহাইয়ের পরীক্ষাটি ছিল কৃত্রিম কিডনিতে পরিচালিত একটি প্রদর্শনী। তাই এটিকে বাস্তব রোগীর ওপর সফল অস্ত্রোপচারের উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। অস্ট্রেলিয়ায় রোগীদের চিকিৎসায় এ প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ অনুমোদন, আইনি ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত দায়বদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। রোগীর পাশে একটি চিকিৎসক দল রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক।

প্রযুক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে দূরনিয়ন্ত্রিত রোবটের সাহায্যে বাস্তব রোগীর অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তবে আন্তমহাদেশীয় দূরত্বে এ ধরনের চিকিৎসা নিয়মিতভাবে চালু করতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

নেটওয়ার্কের বিকল্প ব্যবস্থা, রোবটের নির্ভুলতা, অস্ত্রোপচারের সময় জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানীয় চিকিৎসক দলের হস্তক্ষেপ এবং তথ্য আদান-প্রদানের নিরাপত্তা—সবকিছুই এ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সিডনি থেকে সাংহাইয়ে পরিচালিত পরীক্ষাটি দূরবর্তী রোবটিক অস্ত্রোপচারের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা তুলে ধরেছে। তবে বাস্তব চিকিৎসায় এর বিস্তৃত ব্যবহার নির্ভর করবে আরও পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর।

তথ্যসূত্র: অস্ট্রেলিয়ার 7NEWS এবং The Australia Today

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত