জাতিসংঘের প্রথম নারী মহাসচিব হতে পারেন লানা নুসায়বেহ, সমর্থনে যুক্তরাজ্য
বিশ্ব · 2026-10-27T08:06:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব পদে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কূটনীতিক লানা জাকি নুসায়বেহকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই। তবে লন্ডন এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। নুসায়বেহ নির্বাচিত হলে তিনি হবেন জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রথম নারী মহাসচিব এবং মিসরের বুত্রোস বুত্রোস-ঘালির পর দ্বিতীয় মধ্যপ্রাচ্যীয় মহাসচিব।
২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে নুসায়বেহর নাম জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব পদে মনোনীত করে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। নতুন মহাসচিব ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তবে নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ এবং সাধারণ পরিষদের অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রার্থীই এই পদে নির্বাচিত হতে পারবেন না।
নুসায়বেহকে সমর্থনের কথা ভাবছে যুক্তরাজ্য
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ সরকারের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র নুসায়বেহর প্রার্থিতার প্রতি যুক্তরাজ্যের ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়েছে। তবে দেশটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেনি।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র সংবাদমাধ্যমটিকে বলেছেন, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে বের করাই তাঁদের প্রধান অগ্রাধিকার। প্রার্থীদের যোগ্যতা বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তবে নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নুসায়বেহর প্রার্থিতা নিয়ে যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য অবস্থান এমন এক সময়ে আলোচনায় এসেছে, যখন জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচন নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স—এই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের প্রত্যেকেরই ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। ফলে কোনো প্রার্থীকে নির্বাচিত করার ক্ষেত্রে তাঁদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
কে এই লানা নুসায়বেহ?
১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া ৪৮ বছর বয়সী লানা জাকি নুসায়বেহ সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক। তিনি বর্তমানে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন।
জাতিসংঘে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সাধারণ পরিষদের সহসভাপতি, জাতিসংঘের নারী সংস্থা ইউএন উইমেনের নির্বাহী বোর্ডের সভাপতি এবং নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২–২০২৩ মেয়াদে সংযুক্ত আরব আমিরাত নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য থাকাকালে তিনি দুইবার পরিষদের সভাপতিত্ব করেন।
গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর বিষয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ২০২৩ সালের ২৭২০ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর কূটনৈতিক ভূমিকা ছিল। নুসায়বেহর দাবি, রাফাহ সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনের ব্যবস্থা করে তিনি নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের পরিস্থিতি সরাসরি বোঝার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তাঁর প্রচারের মূল বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় কূটনীতি জোরদার, মতপার্থক্য কমানো এবং জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নুসায়বেহর পারিবারিক শিকড় ফিলিস্তিনে। তাঁর দাদা আনোয়ার নুসায়বেহ ছিলেন পরিচিত ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিক। এই পারিবারিক পটভূমির পাশাপাশি দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করে তুলেছে।
কেন বিতর্কে তাঁর প্রার্থিতা?
নুসায়বেহর প্রার্থিতা নিয়ে বিতর্কের একটি বড় কারণ সুদানের গৃহযুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কথিত ভূমিকা। সুদানের সেনাবাহিনী ও আধা সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে চলমান সংঘাতে আমিরাতের বিরুদ্ধে আরএসএফকে অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও তদন্তকারীরা সুদানে আরএসএফের বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষ হত্যা, যৌন সহিংসতা এবং অন্যান্য গুরুতর অপরাধের অভিযোগ নথিভুক্ত করেছেন। দারফুরের আল-ফাশারসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের কিছু ঘটনায় তদন্তকারীরা গণহত্যার লক্ষণ থাকার কথাও উল্লেখ করেছেন। তবে আরএসএফকে আমিরাতের সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ এবং নুসায়বেহর ব্যক্তিগত দায়—এই দুটি বিষয় এক করে দেখা যায় না।
রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে নুসায়বেহ বলেছেন, তিনি তাঁর আমিরাত সরকারের দায়িত্ব থেকে ছুটি নিয়েছেন এবং সুদানের মানবিক সংকট মোকাবিলায় গুরুত্ব দিতে চান। তাঁর প্রার্থিতার ক্ষেত্রে আমিরাতের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রশ্নগুলো কীভাবে বিবেচিত হবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্কও আলোচনায়
নুসায়বেহর প্রার্থিতা নিয়ে আরেকটি বিতর্কের বিষয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। এরপর বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়িয়েছে দেশ দুটি।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে আমিরাতের অবস্থান ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি নুসায়বেহর কূটনৈতিক জীবনেরও অংশ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পশ্চিম তীরের কিছু অংশ সংযুক্ত করার ইসরায়েলি পরিকল্পনার বিরোধিতা করে তিনি তা স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্কের কারণে নুসায়বেহকে সমর্থন বা বিরোধিতা করার বিষয়টি বিভিন্ন দেশের নিজস্ব কূটনৈতিক হিসাবের ওপর নির্ভর করবে। মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রার্থীর অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, নিরপেক্ষতা এবং নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের অবস্থান—সবই গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের প্রথম নারী মহাসচিব হওয়ার সম্ভাবনা
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো নারী মহাসচিব নির্বাচিত হননি। নুসায়বেহ নির্বাচিত হলে তিনি এই পদে প্রথম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়বেন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দ্বিতীয় মহাসচিব হবেন তিনি; এর আগে মিসরের বুত্রোস বুত্রোস-ঘালি ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন।
তবে নুসায়বেহ একমাত্র প্রার্থী নন। ২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর পর্যন্ত জাতিসংঘের প্রকাশিত তালিকায় আরও কয়েকজন প্রার্থীর নাম রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের অনানুষ্ঠানিক ভোটাভুটিতে কোনো প্রার্থীই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কাছ থেকে সর্বসম্মত সমর্থন পাননি বলে রয়টার্স জানিয়েছে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো উন্মুক্ত এবং পরবর্তী পর্যায়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করবে এবং সাধারণ পরিষদ তাঁকে মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেবে। যুক্তরাজ্য নুসায়বেহকে সমর্থন করলে তাঁর কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে, তবে শুধু একটি দেশের সমর্থন তাঁর নির্বাচন নিশ্চিত করবে না।
সব মিলিয়ে, লানা নুসায়বেহর প্রার্থিতা জাতিসংঘের নেতৃত্ব নির্বাচনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা যেমন আলোচনায় রয়েছে, তেমনি আমিরাতের আঞ্চলিক নীতি ও সুদানের সংঘাত নিয়ে বিতর্কও তাঁর প্রার্থিতাকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। শেষ পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হবেন কি না, তা নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ ও সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের ওপর।