শ্রীমঙ্গলের সময়

ইসরায়েলে ভোট আজ, নেতানিয়াহুর সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ

বিশ্ব · 2026-10-27T07:17:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

ইসরায়েলে আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত হচ্ছে পার্লামেন্ট নির্বাচন। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই এবং সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা ঘিরে ভোটকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। তবে নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপে কোনো জোটই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে ভোটের পরও দেশটিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং এরপর গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। নিরাপত্তা পরিস্থিতি, যুদ্ধের পরিণতি, সরকারের জবাবদিহি এবং সামরিক বাহিনীতে অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের নিয়োগসংক্রান্ত বিতর্ক এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

ইসরায়েলের ১২০ আসনের নেসেটে প্রতিনিধিত্ব পেতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। দেশটির আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনী ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। কোনো দল এককভাবে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে একাধিক দলকে নিয়ে জোট সরকার গঠন করতে হয়।

জরিপে এগিয়ে আইজেনকটের ইয়াশার

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত একাধিক জনমত জরিপে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের মধ্যপন্থি দল ইয়াশারকে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির চেয়ে কিছুটা এগিয়ে থাকতে দেখা গেছে। বিভিন্ন জরিপে ইয়াশারের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ২২ থেকে ২৩ এবং লিকুদের ১৯ থেকে ২১-এর মধ্যে অনুমান করা হয়েছে। তবে জরিপভেদে ফলাফলে পার্থক্য রয়েছে।

জরিপের হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকারের সমর্থক ডানপন্থি ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট প্রায় ৫০টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দলগুলোর সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৫২ থেকে ৫৬-এর মধ্যে থাকতে পারে। আরব দলগুলো পেতে পারে আনুমানিক ১৪ থেকে ১৬টি আসন।

এই হিসাব অনুযায়ী, কোনো পক্ষই এককভাবে ৬১ আসনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। ফলে নির্বাচনের পর ছোট দলগুলোর সমর্থন, জোটের শর্ত এবং রাজনৈতিক সমঝোতা সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে জনমত জরিপের পূর্বাভাসের সঙ্গে প্রকৃত ফলের পার্থক্য থাকতে পারে।

নেতানিয়াহুর সামনে নিরাপত্তা ও জবাবদিহির প্রশ্ন

৭৭ বছর বয়সী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবারের নির্বাচনে জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছিল। হামলার আগাম সতর্কতা, নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং পরবর্তী যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে সরকারের ভূমিকা এখনো রাজনৈতিক বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নেতানিয়াহুর সমালোচকেরা ওই হামলার আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতার জন্য সরকারের জবাবদিহি দাবি করছেন। পাশাপাশি গাজা যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থান এবং সামরিক বাহিনীতে অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টিও নির্বাচনী আলোচনায় রয়েছে।

অন্যদিকে নেতানিয়াহু তাঁর সরকারের নিরাপত্তা ও সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে এবারের নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়, বরং যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তানীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি আইজেনকটের

৬৬ বছর বয়সী গাদি আইজেনকট ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান। নির্বাচনী প্রচারে তিনি সুশাসন, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের বিকল্প হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন তিনি।

তবে কোনো দল সবচেয়ে বেশি আসন পেলেই যে সরকার গঠন করতে পারবে, ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় এমন নিশ্চয়তা নেই। সরকার গঠনের জন্য নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। তাই ইয়াশার সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে এলেও আইজেনকটকে অন্যান্য দলের সমর্থন আদায় করতে হবে।

এ কারণে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দলগুলোর মধ্যে জোট গঠন নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কে কার সঙ্গে সরকার গঠনে রাজি হবে, কোন দল কী শর্ত দেবে এবং আরব দলগুলোর সমর্থন কীভাবে কাজে লাগানো হবে—এসব বিষয় শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার সমীকরণ নির্ধারণ করতে পারে।

সরকার গঠনে আরব দলগুলোর ভূমিকা

ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জরিপে তাদের সম্মিলিত আসনসংখ্যা ১৪ থেকে ১৬-এর মধ্যে অনুমান করা হয়েছে। কোনো বড় জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে এই দলগুলোর সমর্থন সরকার গঠনের হিসাব বদলে দিতে পারে।

তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে বিরোধী জোটের সমঝোতা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সরাসরি সরকারে যোগ দেওয়া কিংবা বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার মতো বিভিন্ন রাজনৈতিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এসব সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে নির্বাচনের ফল এবং সংশ্লিষ্ট দলগুলোর অবস্থানের ওপর।

ভোটগ্রহণ ও ফল প্রকাশ

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার কথা এবং চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত। ভোট শেষ হওয়ার পর বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশ করা হতে পারে। তবে এসব জরিপ চূড়ান্ত ফল নয়; ভোট গণনা ও নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরই প্রকৃত আসনসংখ্যা জানা যাবে।

নির্বাচন কমিশনের সময়সূচি অনুযায়ী, চূড়ান্ত ফল প্রকাশের নির্ধারিত তারিখ ৪ নভেম্বর। এর পরও সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতা প্রয়োজন হতে পারে।

সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় ফিরবেন, নাকি আইজেনকটের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হবে—তা নির্ভর করছে ভোটের ফল এবং পরবর্তী জোট আলোচনার ওপর। কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারায় নির্বাচনের পরও ইসরায়েলের রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

তথ্যসূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), রয়টার্স

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত