আয় বাড়লেও স্বস্তি নেই, সংসারের খরচে নাকাল বেসরকারি চাকরিজীবীরা
জাতীয় · 2026-10-26T14:26:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বেসরকারি চাকরিজীবীরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ, বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধির হার ৭.৯০ শতাংশ। ফলে আয় বাড়লেও অনেক কর্মীর ক্রয়ক্ষমতা বাড়তি চাপের মুখে রয়েছে।
রাজধানীতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন ওয়াসিউর রহমান। ম্যানেজার হিসেবে তাঁর অধীনে কাজ করেন অন্তত ২০ জন কর্মী। পেশাগত প্রয়োজনে নিয়মিত বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত, গ্রাহকদের সঙ্গে বৈঠক, মাঠপর্যায়ের কাজ তদারকি এবং প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত পোশাক ও যোগাযোগের মান বজায় রাখতে হয় তাঁকে। এসব কাজে যাতায়াত, মুঠোফোন ও ইন্টারনেটসহ নানা খাতে নিজের পকেট থেকেও অর্থ ব্যয় করতে হয়। কিন্তু মাস শেষে বেতন হাতে পাওয়ার পর বাজারদর ও সংসারের খরচের সঙ্গে হিসাব মেলাতে গিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি।
ওয়াসিউর রহমানের অভিজ্ঞতা বেসরকারি খাতের অনেক কর্মীর আর্থিক চাপের চিত্র তুলে ধরে। পদ ও কাজের ধরন আলাদা হলেও নিত্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা এবং সন্তানের শিক্ষার ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেকেরই সঞ্চয়ের সুযোগ কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে চাকরিসংশ্লিষ্ট বাড়তি খরচ, যার পুরোটা অনেক প্রতিষ্ঠানে ভাতা হিসেবে পাওয়া যায় না।
মূল্যস্ফীতির চেয়ে পিছিয়ে মজুরি বৃদ্ধি
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৮.৩৪ শতাংশে। আগের মাস আগস্টে এ হার ছিল ৮.২৬ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে ৭.৯০ শতাংশে নেমে আসে, যা আগস্টে ছিল ৮.০৫ শতাংশ।
অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে ০.৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি ছিল। এর অর্থ, মজুরি বাড়লেও সামগ্রিকভাবে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার সঙ্গে সেই বৃদ্ধি তাল মেলাতে পারছে না। ফলে নির্দিষ্ট আয়ের কর্মীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা চাপে পড়ছে।
উত্তরায় একটি বায়িং হাউসে জুনিয়র কর্মী হিসেবে কাজ করেন সোহেল রানা। কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিন বিভিন্ন পোশাক কারখানায় যাতায়াত করতে হয় তাঁকে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াত এবং বাইরে দুপুরের খাবার খাওয়ার পেছনে বেতনের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হয়। প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া যাতায়াত ভাতা অনেক সময় প্রকৃত খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট হয় না। ফলে বাড়তি টাকা নিজের পকেট থেকেই দিতে হয়।
এ ধরনের পেশাগত ব্যয় বেতনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে কাজ করা কর্মীদের ক্ষেত্রে যাতায়াত ও খাবারের খরচ নিয়মিত হওয়ায় মাস শেষে হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
পাঁচ বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বেড়েছে
বিবিএসের অর্থবছরভিত্তিক গড় মূল্যস্ফীতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১–২২ অর্থবছরে এ হার ছিল ৬.১৫ শতাংশ। ২০২২–২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯.০২ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৭৩ শতাংশ, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১০.০৩ শতাংশ এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৮.৬৮ শতাংশ।
এই হারগুলো ধারাবাহিকভাবে হিসাব করলে পাঁচ বছরের ব্যবধানে সাধারণ মূল্যস্তর প্রায় ৫২ শতাংশ বেড়েছে। এর মানে, পাঁচ বছর আগে যে পণ্য ও সেবা কিনতে ২০ হাজার টাকা লাগত, একই পরিমাণ পণ্য ও সেবা কিনতে এখন আনুমানিক ৩০ হাজার ৪০০ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। তবে এটি মূল্যস্ফীতির হার থেকে করা একটি উদাহরণভিত্তিক হিসাব; প্রত্যেক পরিবারের প্রকৃত ব্যয় একই হারে বাড়েনি।
আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ব্যবধান বোঝাতে আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যায়। কোনো কর্মীর মাসিক বেতন পাঁচ বছর আগে ২০ হাজার টাকা ছিল এবং প্রতিবছর তাঁর বেতন ১ হাজার ৫০০ টাকা করে বেড়েছে—এমনটি ধরে নিলে পাঁচ বছরে মোট বৃদ্ধি দাঁড়ায় ৭ হাজার ৫০০ টাকা। সে হিসাবে বর্তমান বেতন হবে ২৭ হাজার ৫০০ টাকা।
অন্যদিকে, একই সময়ের মূল্যস্তর প্রায় ৫২ শতাংশ বেড়ে থাকলে আগের ২০ হাজার টাকার সমপরিমাণ পণ্য ও সেবা কিনতে এখন প্রায় ৩০ হাজার ৪০০ টাকা প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ এই উদাহরণে বর্তমান বেতন ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের মধ্যে মাসে প্রায় ২ হাজার ৯০০ টাকার ব্যবধান তৈরি হয়।
বাস্তবে বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি, চাকরি পরিবর্তন, পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও ব্যয়ের ধরন অনুযায়ী এই ব্যবধান একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। তবে উদাহরণটি দেখায়, বেতন বাড়লেই যে আগের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখা সম্ভব হবে, তা নয়।
শুধু বাজার খরচ নয়, বাড়তি চাপ পেশাগত ব্যয়েও
বেসরকারি চাকরিতে কর্মীর পদ ও দায়িত্ব অনুযায়ী কিছু খরচ সরাসরি কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারীদের যাতায়াত, বাইরে খাবার, মুঠোফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ হতে পারে। অন্যদিকে অফিসে কাজ করা কর্মীদেরও পোশাক, কর্মক্ষেত্রের উপযোগী উপস্থিতি এবং যাতায়াতের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে হয়।
মিরপুরের একটি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগে কর্মরত এক কর্মকর্তা জানান, নিয়মিত মাঠপর্যায়ে কাজ না থাকলেও অফিসের পরিবেশ ও পেশাগত মান বজায় রাখতে কিছু অতিরিক্ত ব্যয় হয়। পাশাপাশি মা–বাবার চিকিৎসা এবং সন্তানের শিক্ষার খরচ মেটানোর পর মাস শেষে সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা কোম্পানিভেদে ভিন্ন হওয়ায় সব কর্মীর অভিজ্ঞতাও এক নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত বা মুঠোফোন ভাতা দেওয়া হয়, আবার কোথাও কর্মীকেই এসব খরচের বড় অংশ বহন করতে হয়। ফলে একই বেতন পেলেও পেশাগত ব্যয়ের পার্থক্যের কারণে হাতে থাকা অর্থে ব্যবধান তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেও চাপ
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের অক্টোবরের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রতিবেদনে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের দুর্বলতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে পরিবারগুলোর নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে বেতনভোগী কর্মীদের জন্য আয় থেকে সঞ্চয় করা এবং জরুরি ব্যয় সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বেসরকারি খাতে সবার জন্য একই ধরনের কেন্দ্রীয় বেতনকাঠামো নেই। প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত, দক্ষতা ও দায়িত্ব অনুযায়ী বেতন ও ইনক্রিমেন্টের পরিমাণ ভিন্ন হয়। ফলে মূল্যস্ফীতির প্রভাব সব কর্মীর ওপর সমানভাবে পড়ে না। যাঁদের বেতন তুলনামূলক কম বাড়ে বা চাকরিসংশ্লিষ্ট ব্যয় বেশি, তাঁদের জন্য চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের আয় ও সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন—এই বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মুদ্রানীতি, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং সরবরাহব্যবস্থার বাধা কমানো গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও কর্মীদের দায়িত্ব অনুযায়ী যাতায়াত ও যোগাযোগের খরচের বাস্তবসম্মত ভাতা, স্বচ্ছ বেতননীতি এবং নিয়মিত বেতন পর্যালোচনা কর্মীদের আর্থিক চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে এসব সুবিধা প্রতিষ্ঠানভেদে নির্ধারিত হয় এবং বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট নীতি ও শ্রম আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সানেমের গবেষণা পরিচালক মাহতাব উদ্দিন মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় কার্যকর মুদ্রানীতি, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় পর্যালোচনা, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো এবং বেসরকারি খাতে কর্মীদের বেতন ও দর-কষাকষির সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, বেসরকারি চাকরিজীবীদের সংকট শুধু বেতন কত বাড়ল, সেই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিত্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় এবং কাজের প্রয়োজনে নিজস্ব পকেট থেকে করা খরচ—সব মিলিয়েই মাসিক বাজেট তৈরি হয়। মূল্যস্ফীতির তুলনায় আয় বাড়ার গতি কম থাকলে বেতন বৃদ্ধি সত্ত্বেও সংসারের স্বস্তি ফিরতে দেরি হতে পারে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট এবং প্রদত্ত প্রতিবেদনে উল্লেখিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য।