বিদেশে যাওয়ার আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা: প্রবাসীদের জন্য যেসব প্রস্তুতি জরুরি
জাতীয় · 2026-10-28T14:18:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
বিদেশে কাজ, পড়াশোনা কিংবা বসবাসের উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগে পাসপোর্ট, ভিসা, বিমানের টিকিট ও লাগেজ গোছানোর পাশাপাশি নিজের স্বাস্থ্যের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, গন্তব্য দেশের নিয়ম অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নির্দিষ্ট টিকা, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি কিংবা স্বাস্থ্যবিমার প্রয়োজন হতে পারে। এসব বিষয়ে আগে থেকে প্রস্তুতি না থাকলে ভিসা বা কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে, এমনকি যাত্রার সময়ও বাড়তি ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।
বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, মালয়েশিয়া কিংবা অন্য কোনো দেশে কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষার নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ। তবে সব দেশের স্বাস্থ্য পরীক্ষার শর্ত এক নয়। কাজের ভিসা, শিক্ষার্থী ভিসা, ভ্রমণ ভিসা এবং দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের অনুমতির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথি ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত শর্ত আলাদা হতে পারে।
তাই বিদেশে যাওয়ার আগে কোথায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে, কোন টিকা প্রয়োজন হতে পারে, নিয়মিত ওষুধ কীভাবে সঙ্গে নিতে হবে এবং চিকিৎসার নথি কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
বিদেশে যাওয়ার আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কেন প্রয়োজন?
বিদেশযাত্রার আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার প্রধান উদ্দেশ্য হলো যাত্রীর স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণা পাওয়া এবং গন্তব্য দেশের নির্ধারিত স্বাস্থ্যসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করা। তবে সব যাত্রীর জন্য একই ধরনের পরীক্ষা বাধ্যতামূলক নয়।
বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশ ও কর্মসূচির নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদিত চিকিৎসাকেন্দ্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হতে পারে। পরীক্ষায় কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে, তা গন্তব্য দেশ, ভিসার ধরন এবং প্রযোজ্য নীতিমালার ওপর নির্ভর করে।
কিছু ক্ষেত্রে রক্ত পরীক্ষা, বুকের এক্স-রে, শারীরিক পরীক্ষা কিংবা নির্দিষ্ট সংক্রামক রোগের পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। তবে সব দেশের জন্য একই পরীক্ষার তালিকা প্রযোজ্য নয়। তাই পরিচিত কারও মেডিকেল রিপোর্ট দেখে নিজের পরীক্ষার তালিকা নির্ধারণ না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুধু বিদেশ যাওয়ার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়ারও একটি সুযোগ। কোনো রোগ বা শারীরিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করতে হলে নিয়মিত চিকিৎসা, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনা করাও সহজ হয়।
বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিদেশগামী বাংলাদেশি কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রকাশ করেছে। ফলে কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম এবং বাংলাদেশের প্রযোজ্য সরকারি নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
বিদেশগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কোথায় করাতে হবে?
বিদেশে চাকরির উদ্দেশ্যে যাওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর আগে নিশ্চিত হতে হবে, সংশ্লিষ্ট গন্তব্য দেশ বা কর্মসূচি কোন ধরনের চিকিৎসাকেন্দ্রের রিপোর্ট গ্রহণ করে।
কিছু দেশের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বা অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার থেকে পরীক্ষা করানো বাধ্যতামূলক হতে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের নির্দিষ্ট দেশগুলোর জন্য প্রযোজ্য কর্মী স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রক্রিয়া আলাদা হতে পারে। তাই সাধারণ কোনো হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করালেই সেই রিপোর্ট বিদেশে চাকরির আবেদনে গ্রহণ করা হবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
প্রথমে নিয়োগকর্তা, অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি অথবা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে কোন মেডিকেল সেন্টারে পরীক্ষা করাতে হবে। এরপর পরীক্ষার তারিখ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফি এবং রিপোর্ট সংগ্রহের পদ্ধতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।
স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর সময় পাসপোর্ট, পরিচয়পত্র, আবেদনসংক্রান্ত তথ্য এবং নির্ধারিত অন্যান্য নথি প্রয়োজন হতে পারে। কোন নথি লাগবে, তা সংশ্লিষ্ট মেডিকেল সেন্টার থেকে আগে জেনে নেওয়া ভালো।
এ ছাড়া মেডিকেল পরীক্ষার রিপোর্ট কত দিন পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো রিপোর্টের নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকলে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে পরীক্ষা করাতে হতে পারে। তাই ভিসা, মেডিকেল ও ফ্লাইটের সময়সূচি সমন্বয় করে এগোনো উচিত।
স্বাস্থ্য পরীক্ষার আগে কী কী প্রস্তুতি নেবেন?
স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে যাওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় প্রস্তুত রাখলে প্রক্রিয়াটি সহজ হয়।
প্রথমত, প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র ও ভ্রমণসংক্রান্ত নথি সঙ্গে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আগে থেকে কোনো রোগের চিকিৎসা চললে তার প্রেসক্রিপশন, পরীক্ষার রিপোর্ট এবং ওষুধের তালিকা সঙ্গে রাখা ভালো। তৃতীয়ত, চিকিৎসক বা মেডিকেল সেন্টারের দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
কিছু পরীক্ষার আগে নির্দিষ্ট সময় না খেয়ে থাকতে হতে পারে, আবার কিছু পরীক্ষার ক্ষেত্রে এমন নির্দেশনা প্রয়োজন হয় না। তাই সব পরীক্ষার আগে নিজে থেকে উপবাস না করে সংশ্লিষ্ট মেডিকেল সেন্টার বা চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে হবে।
পরীক্ষার আগে নিজের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য গোপন না করাও গুরুত্বপূর্ণ। আগে কোনো অস্ত্রোপচার হয়ে থাকলে, নিয়মিত ওষুধ খেলে, কোনো ওষুধে অ্যালার্জি থাকলে অথবা দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে চিকিৎসককে জানাতে হবে।
স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কোনো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠলে চিকিৎসকের কাছ থেকে তার ব্যাখ্যা জেনে নেওয়া উচিত। শুধু রিপোর্টে কোনো শব্দ দেখে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করা কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ শুরু করা ঠিক নয়।
বিদেশে যাওয়ার আগে কোন কোন টিকা প্রয়োজন হতে পারে?
বিদেশে যাওয়ার আগে কোন টিকা নিতে হবে, তা নির্ভর করে গন্তব্য দেশ, ভ্রমণের উদ্দেশ্য, যাত্রীর বয়স, আগের টিকাদানের ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট দেশের প্রবেশবিধির ওপর।
কিছু টিকা নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির অংশ। আবার নির্দিষ্ট দেশে যাত্রা, বিশেষ ধরনের ভ্রমণ বা সংক্রামক রোগের ঝুঁকির কারণে অতিরিক্ত টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। কিছু পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট টিকার প্রমাণপত্র প্রবেশের শর্ত হিসেবেও চাওয়া হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, সৌদি আরবে হজে যাওয়া নির্দিষ্ট যাত্রীদের জন্য মেনিনজোকক্কাল টিকার শর্ত রয়েছে। আবার হলুদ জ্বরের ঝুঁকিপূর্ণ দেশ থেকে আসা কিছু যাত্রীর ক্ষেত্রে হলুদ জ্বরের টিকার সনদ প্রয়োজন হতে পারে। এসব শর্ত যাত্রার ধরন, পূর্ববর্তী অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট দেশের বর্তমান বিধির ওপর নির্ভর করে।
তবে সব প্রবাসীর জন্য একই টিকা বাধ্যতামূলক—এমন ধারণা ঠিক নয়। কাজের ভিসায় সৌদি আরব, মালয়েশিয়া বা অন্য দেশে যাওয়া প্রত্যেক যাত্রীর জন্য একই টিকার তালিকা প্রযোজ্য হবে, এমনটিও বলা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) আন্তর্জাতিক যাত্রীদের যাত্রার অন্তত চার থেকে ছয় সপ্তাহ আগে চিকিৎসক বা ভ্রমণ-স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করার সুপারিশ করে। কারণ, কিছু টিকার একাধিক ডোজ প্রয়োজন হতে পারে এবং টিকা কার্যকর হতে সময় লাগতে পারে।
তাই বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলে গন্তব্য দেশের স্বাস্থ্যবিধি যাচাই করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা নিন।
টিকা নেওয়ার সনদ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কিছু দেশ বা নির্দিষ্ট ভ্রমণ কর্মসূচিতে টিকা নেওয়ার প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পর সনদ বা সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ করে নিরাপদে সংরক্ষণ করা জরুরি।
সনদে নাম, পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, টিকার ধরন এবং প্রযোজ্য অন্যান্য তথ্য সঠিক আছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। নাম বা পাসপোর্টের তথ্যের সঙ্গে অসংগতি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সংশোধনের ব্যবস্থা করা উচিত।
যাত্রার আগে সনদের কাগজের কপি ও ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তবে ডিজিটাল কপি রাখলেই সব দেশে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। গন্তব্য দেশ কাগজের সনদ, ডিজিটাল সনদ অথবা নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক সনদ চায় কি না, তা আগে থেকে জেনে নিতে হবে।
টিকার সনদ হারিয়ে গেলে বা তথ্য ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট টিকাদান কেন্দ্র কিংবা অনুমোদিত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। ভুয়া সনদ সংগ্রহ বা ব্যবহার করা আইনগত জটিলতা তৈরি করতে পারে।
নিয়মিত ওষুধ খেলে বিদেশে যাওয়ার আগে কী করবেন?
যাঁরা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি, থাইরয়েডের সমস্যা কিংবা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগের জন্য নিয়মিত ওষুধ খান, তাঁদের বিদেশযাত্রার আগে চিকিৎসা-পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন।
প্রথমেই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে যাত্রার সময় ও বিদেশে অবস্থানের মেয়াদ অনুযায়ী ওষুধের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করতে হবে। কত দিন ওষুধ প্রয়োজন হবে, কোনো ওষুধের ডোজ পরিবর্তনের দরকার আছে কি না এবং দীর্ঘ ফ্লাইটে ওষুধ কীভাবে ব্যবহার করতে হবে—এসব বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
প্রয়োজনীয় ওষুধ মূল প্যাকেটে রাখা সুবিধাজনক। সম্ভব হলে প্রেসক্রিপশন ও ওষুধের জেনেরিক নামের তালিকাও সঙ্গে রাখতে হবে। বিদেশে একই ব্র্যান্ডের ওষুধ পাওয়া নাও যেতে পারে, তাই ওষুধের প্রকৃত নাম জানা থাকলে চিকিৎসা নিতে সুবিধা হয়।
তবে সব ওষুধ সব দেশে বহন করা যায় না। কিছু ঘুমের ওষুধ, ব্যথানাশক, মানসিক রোগের ওষুধ কিংবা নিয়ন্ত্রিত উপাদানযুক্ত ওষুধের ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমতি বা প্রেসক্রিপশন প্রয়োজন হতে পারে। কোনো কোনো দেশে নির্দিষ্ট ওষুধের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে।
তাই ওষুধ সঙ্গে নেওয়ার আগে গন্তব্য দেশের দূতাবাস, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ বা নির্ভরযোগ্য সরকারি নির্দেশনা থেকে নিয়ম যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ও ওষুধের বিবরণ ইংরেজিতে সংগ্রহ করে রাখা যেতে পারে।
বিমানে ওষুধ কীভাবে সঙ্গে রাখবেন?
বিদেশযাত্রার সময় জরুরি ওষুধ বড় লাগেজে না রেখে হাতব্যাগে রাখা সাধারণত বেশি সুবিধাজনক। কারণ, চেকড লাগেজ দেরিতে পৌঁছালে বা হারিয়ে গেলে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া কঠিন হতে পারে।
তবে ওষুধ বহনের ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাবিধি এবং এয়ারলাইনের নিয়ম মানতে হবে। তরল ওষুধ, ইনজেকশন, সিরিঞ্জ কিংবা বিশেষ চিকিৎসাসামগ্রী বহনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নথি বা অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে।
যাঁদের নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ে ওষুধ খেতে হয়, তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের সময়সূচি তৈরি করে নিতে পারেন। একাধিক সময় অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাত্রা করলে ওষুধের সময় কীভাবে সমন্বয় করতে হবে, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো।
এ ছাড়া ওষুধের প্রয়োজনীয় পরিমাণ হিসাব করার সময় ফ্লাইট বিলম্ব বা যাত্রার সময় বাড়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা উচিত। তবে অতিরিক্ত ওষুধ বহনের ক্ষেত্রেও গন্তব্য দেশের বিধিনিষেধ অনুসরণ করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে বিদেশযাত্রার আগে কী করবেন?
দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলেই বিদেশে যাওয়া যাবে না, এমন নয়। তবে রোগের ধরন, বর্তমান শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসার প্রয়োজন এবং গন্তব্য দেশের নিয়ম অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
যাঁদের নিয়মিত চিকিৎসা প্রয়োজন, তাঁদের যাত্রার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী বর্তমান চিকিৎসার সারসংক্ষেপ, ওষুধের তালিকা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে লিখিত নির্দেশনা দিতে পারেন।
যদি কোনো রোগের কারণে বিশেষ খাবার, নির্দিষ্ট চিকিৎসাসামগ্রী বা নিয়মিত পরীক্ষা প্রয়োজন হয়, তাহলে বিদেশে এসব সুবিধা কীভাবে পাওয়া যাবে, তা আগে থেকে খোঁজ নেওয়া ভালো।
বিদেশে চিকিৎসার খরচ, স্বাস্থ্যবিমার আওতা এবং নিয়োগকর্তা চিকিৎসাসুবিধা দেবে কি না—এসব বিষয়ও যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে কাজের ভিসায় গেলে নিয়োগচুক্তিতে চিকিৎসা ও বিমা-সংক্রান্ত শর্ত কী রয়েছে, তা বুঝে নেওয়া উচিত।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ওষুধ বন্ধ করা কিংবা বিদেশ যাওয়ার আগে নতুন ওষুধ শুরু করা উচিত নয়। যাত্রার সময় গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিলে ফ্লাইটের আগে চিকিৎসা নেওয়া এবং প্রয়োজনে এয়ারলাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি।
বিদেশে যাওয়ার আগে স্বাস্থ্যবিমা ও চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে জানুন
বিদেশে অসুস্থ হলে চিকিৎসা ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে বেশি হতে পারে। তাই যাত্রার আগে গন্তব্য দেশে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার নিয়ম এবং নিজের স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা সম্পর্কে জানা গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু দেশে বিদেশি কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবিমা বা নিয়োগকর্তার মাধ্যমে চিকিৎসাসুবিধার ব্যবস্থা থাকতে পারে। আবার ভ্রমণ বা শিক্ষার্থী ভিসায় গেলে আলাদা বিমা প্রয়োজন হতে পারে। কোন সুবিধা বাধ্যতামূলক, তা ভিসার ধরন ও গন্তব্য দেশের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
বিমা থাকলে কোন কোন চিকিৎসা খরচ বহন করা হবে, হাসপাতালে ভর্তি, জরুরি চিকিৎসা, ওষুধ কিংবা দেশে ফেরত পাঠানোর খরচের ক্ষেত্রে কী শর্ত রয়েছে, তা ভালোভাবে পড়ে নিতে হবে।
শুধু বিমা কার্ড থাকলেই সব চিকিৎসা বিনা মূল্যে পাওয়া যাবে, এমন ধারণা করা ঠিক নয়। বিমার আওতা, নিজস্ব খরচ, অনুমোদিত হাসপাতাল এবং দাবি জানানোর নিয়ম আলাদা হতে পারে।
বিদেশে পৌঁছানোর পর নিকটবর্তী হাসপাতাল, চিকিৎসাকেন্দ্র এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণ করে রাখা ভালো। প্রয়োজন হলে স্থানীয় বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটের যোগাযোগের তথ্যও সঙ্গে রাখা যেতে পারে।
বিদেশযাত্রার আগে মেডিকেল রিপোর্ট ও প্রয়োজনীয় নথি কীভাবে রাখবেন?
স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর মেডিকেল রিপোর্ট, টিকাদানের সনদ এবং চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হবে। যেসব নথি ভিসা বা কর্মসংস্থানের প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন, সেগুলোর মূল কপি ও প্রয়োজনীয় অনুলিপি আলাদা করে রাখা ভালো।
মোবাইল ফোনে নথির ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তবে শুধু ফোনের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজনীয় নথির কাগজের কপিও সঙ্গে রাখা সুবিধাজনক।
পাসপোর্টের তথ্যের সঙ্গে মেডিকেল রিপোর্ট বা টিকাদানের সনদের নাম ও অন্যান্য পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য মিলিয়ে দেখা উচিত। কোনো ভুল থাকলে যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে সংশোধন করাতে হবে।
চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তির কাছে দেওয়া উচিত নয়। অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার, নিয়োগকর্তা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন অনুযায়ী নথি জমা দিতে হবে।
এ ছাড়া রিপোর্টের মেয়াদ, পুনরায় পরীক্ষার প্রয়োজন এবং ভিসার সঙ্গে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো শর্ত যুক্ত আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিদেশে পৌঁছানোর পর অসুস্থ হলে কী করবেন?
বিদেশে পৌঁছানোর পর জ্বর, শ্বাসকষ্ট, তীব্র ব্যথা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা অন্য কোনো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসাসেবা নেওয়া প্রয়োজন। জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানীয় জরুরি নম্বর বা নিকটবর্তী হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
সাধারণ অসুস্থতার ক্ষেত্রেও নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য ওষুধ শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বিদেশে ওষুধের নাম, মাত্রা ও ব্যবহারের নিয়ম ভিন্ন হতে পারে।
চিকিৎসা নিতে গেলে পাসপোর্ট, স্বাস্থ্যবিমার তথ্য, নিয়মিত ওষুধের তালিকা এবং প্রাসঙ্গিক চিকিৎসা নথি সঙ্গে রাখা সুবিধাজনক। ভাষাগত সমস্যা থাকলে নিজের রোগ, অ্যালার্জি ও ওষুধের তথ্য ইংরেজিতে লিখে রাখা যেতে পারে।
যাঁরা কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন, তাঁদের নিয়োগকর্তা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিকিৎসাসুবিধার নিয়ম জেনে নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তা চাওয়া যেতে পারে।
বিদেশযাত্রার আগে স্বাস্থ্য প্রস্তুতির চেকলিস্ট
বিদেশে যাওয়ার আগে নিচের বিষয়গুলো একবার যাচাই করে নিন।
১. গন্তব্য দেশের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও মেডিকেল রিপোর্টের নিয়ম জেনে নিন।
২. কাজের ভিসা হলে অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের তথ্য নিশ্চিত করুন।
৩. প্রয়োজনীয় টিকা ও টিকাদানের সনদ সম্পর্কে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৪. নিয়মিত ওষুধের পর্যাপ্ত পরিমাণ এবং বৈধভাবে বহনের নিয়ম যাচাই করুন।
৫. প্রেসক্রিপশন, চিকিৎসার সারসংক্ষেপ ও প্রয়োজনীয় রিপোর্ট সংরক্ষণ করুন।
৬. স্বাস্থ্যবিমা বা নিয়োগকর্তার চিকিৎসাসুবিধার শর্ত জেনে নিন।
৭. গন্তব্য দেশের জরুরি নম্বর ও নিকটবর্তী হাসপাতালের তথ্য সংগ্রহ করুন।
৮. চিকিৎসাসংক্রান্ত নথির কাগজের ও ডিজিটাল কপি নিরাপদে রাখুন।
৯. গন্তব্য দেশের স্বাস্থ্যবিধি বা টিকার শর্ত পরিবর্তিত হয়েছে কি না, যাত্রার আগে আবার যাচাই করুন।