আগামী তিন মাসে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের
সারাদেশ · 2026-11-01T11:33:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
আগামী তিন মাসের মধ্যে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। ব্ল্যাক কার্বন ও অন্যান্য স্বল্পস্থায়ী জলবায়ু দূষক নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ আয়োজনে এক সংলাপে তিনি এ তথ্য জানান।
জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে আগামী তিন মাসের মধ্যে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহর থেকেই ২৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন।
রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ব্ল্যাক কার্বন ও অন্যান্য স্বল্পস্থায়ী জলবায়ু দূষকবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বিজ্ঞান-নীতি সংলাপে এসব তথ্য জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। ‘ক্লিন এয়ার ফান্ড’-এর সহযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ জ্বালানির দিকে যেতে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। তবে আগের সরকারের কাছ থেকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ দূষণকারী জ্বালানির অবকাঠামো উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়ায় এ খাতে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন কয়লা পোড়ানো হয়, যা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্ল্যাক কার্বন নির্গত হয় বলে জানান তিনি।
বায়ুদূষণ কমাতে ইটভাটার বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান শেখ ফরিদুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, দেশের মোট বায়ুদূষণের প্রায় ১৩ শতাংশের জন্য ইটভাটা দায়ী। এসব ভাটায় প্রায়ই উচ্চ সালফারযুক্ত কয়লা ব্যবহার করা হয়। দূষণ নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে কাঠ পোড়ানো ২০০টি ইটভাটা বন্ধ করে সেগুলোর পরিবর্তে কংক্রিট ব্লক উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ইটভাটার ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট দূষণ কমানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদি আমিন বলেন, চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের ডিজিটাল দক্ষতা ও শিল্পভিত্তিক জ্ঞান বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ড. মাহদি আমিন আরও বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়েই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস না করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নির্মল বাতাস ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজকে কেন্দ্র করে জলাধার নির্মাণের মহাপরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানি ও জৈববস্তুর অসম্পূর্ণ দহনের ফলে ব্ল্যাক কার্বন তৈরি হয়। ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল পোড়ানোর পাশাপাশি খড়, কাঠসহ বিভিন্ন জৈব উপাদান পোড়ানোও এর অন্যতম উৎস। ব্ল্যাক কার্বন সূর্যের বিকিরণ শোষণ করে বায়ুমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করতে ভূমিকা রাখে।
তিনি জানান, বাংলাদেশে ব্ল্যাক কার্বনের মাত্রা আগের তুলনায় কমেছে। বর্তমানে নিয়মিত পরিমাপে প্রতি ঘনমিটারে এর পরিমাণ ৬ থেকে ১২ মাইক্রোগ্রামের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে উন্নত ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় এ মাত্রা এখনো বেশি। দূষণ কমাতে যানবাহন ও শিল্পকারখানায় নির্গমন মানদণ্ড কার্যকর, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও গণপরিবহনের প্রসার এবং নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অধ্যাপক আবদুস সালাম আরও বলেন, ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য শুধু জীবাশ্ম জ্বালানি দায়ী নয়; বায়োমাস পোড়ানো এবং আন্তঃসীমান্ত দূষণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ সমস্যা মোকাবিলায় নীতিমালা বাস্তবায়নের পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতা, বায়ুমান পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সুইডেনের নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন সহযোগিতা কৌশলে সবুজ রূপান্তর, জলবায়ু সহনশীলতা ও পরিবেশগতভাবে টেকসই প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশের স্থায়িত্বকে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের যৌথ বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রত্যাশা জানান রাষ্ট্রদূত।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল আউয়াল এবং স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অরজান গুস্তাফসন বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন।