লক্ষণ কয়েক মিনিটেই সেরে যায়, তবু হতে পারে বড় স্ট্রোকের পূর্বাভাস
লাইফস্টাইল · 2026-11-01T10:45:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
হঠাৎ চোখে ঝাপসা দেখা, কথা বলতে অসুবিধা, শরীরের ভারসাম্য হারানো কিংবা হাত-পা অবশ হয়ে আসার মতো লক্ষণ কয়েক মিনিটের মধ্যে সেরে যেতে পারে। তবে এগুলো মিনি-স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্ট্রোকের ঝুঁকির সতর্কসংকেত। তাই এমন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া জরুরি।
ব্রেন স্ট্রোক ও মিনি-স্ট্রোকের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে। ব্রেন স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সাধারণত কথা জড়িয়ে যাওয়া, শরীরের একপাশ অবশ হয়ে যাওয়া কিংবা মুখ বেঁকে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। কখনো শরীরের একপাশ পুরোপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্তও হয়ে যেতে পারে। তবে মিনি-স্ট্রোকের ক্ষেত্রেও লক্ষণগুলো অনেকটা একই রকম হলেও তা সাধারণত অল্প সময়ের জন্য স্থায়ী হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মিনি-স্ট্রোককে বলা হয় ‘ট্রানজিয়েন্ট ইসকেমিক অ্যাটাক’ (টিআইএ)। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হলে এ ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। এর লক্ষণ কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। অনেক সময় লক্ষণ নিজে থেকেই চলে যায়। তবে সাময়িকভাবে সেরে গেলেও এটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ, মিনি-স্ট্রোক ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্ট্রোকের ঝুঁকির গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।
হাঁটার সময় হঠাৎ মাথা ঘোরা, চোখে ঝাপসা দেখা, হাত-পা অবশ হয়ে আসা কিংবা কথা বলতে অসুবিধা হওয়া মিনি-স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। তাই এমন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
কেন হয় মিনি-স্ট্রোক?
মিনি-স্ট্রোকের অন্যতম কারণ হলো রক্তনালিতে চর্বি ও কোলেস্টেরল জমে যাওয়া। দীর্ঘদিন ধরে রক্তনালির দেয়ালে কোলেস্টেরল, চর্বি ও ক্যালসিয়াম জমে প্লাক তৈরি হতে পারে। এতে ধমনি সরু ও শক্ত হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে বলা হয় অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস। ফলে মস্তিষ্কে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এ ছাড়া সরু হয়ে যাওয়া ধমনিতে রক্ত জমাট বেঁধে ছোট ক্লট তৈরি হতে পারে। এই ক্লট রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে মিনি-স্ট্রোক দেখা দিতে পারে।
কখনো শরীরের অন্য অংশ, বিশেষ করে হৃৎপিণ্ড থেকে রক্ত জমাটের ছোট টুকরো রক্তপ্রবাহের সঙ্গে মস্তিষ্কে পৌঁছে সরু ধমনিতে আটকে যায়। এর ফলেও মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
মিনি-স্ট্রোকের ব্যতিক্রমী কিছু লক্ষণ
মিনি-স্ট্রোকের লক্ষণ সব সময় পরিচিত উপসর্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কিছু ব্যতিক্রমী লক্ষণও দেখা দিতে পারে। যেমন—
হঠাৎ কোনো ব্যথা ছাড়াই এক চোখের দৃষ্টিশক্তি আংশিক বা পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে। কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট এমন সমস্যা স্থায়ী হওয়ার পর আবার দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে।
একইভাবে চোখে দুটি করে দেখা বা ডাবল ভিশনও মিনি-স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে রক্ত চলাচল ব্যাহত হলে চোখের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুর কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া কিংবা দুটি ছবি দেখার মতো উপসর্গ তৈরি হয়।
এ ছাড়া হঠাৎ বিভ্রান্তি, সাময়িক স্মৃতিভ্রংশ, অতিরিক্ত উদ্বেগ কিংবা চিন্তাভাবনায় অসংলগ্নতা দেখা দিতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে আচরণ ও মেজাজেও আকস্মিক পরিবর্তন আসতে পারে।
মাথা না ঘুরলেও সোজা হয়ে দাঁড়াতে অসুবিধা হওয়া, হাঁটার সময় শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা কিংবা চলাফেরায় সমন্বয়হীনতা দেখা দেওয়াও সতর্কসংকেত হতে পারে।
মিনি-স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে করণীয়
মিনি-স্ট্রোকের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে তা সাময়িক ভেবে অবহেলা করা যাবে না। অনেকেই ক্লান্তি, মানসিক চাপ কিংবা সাময়িক শারীরিক দুর্বলতা মনে করে এসব উপসর্গ এড়িয়ে যান। এটি বিপজ্জনক হতে পারে। লক্ষণ কয়েক মিনিটের মধ্যে চলে গেলেও দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
পাশাপাশি স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা জরুরি। ধূমপান পরিহার করতে হবে এবং মদ্যপান থেকে বিরত থাকতে হবে। খাদ্যতালিকায় সুষম ও পুষ্টিকর খাবার রাখতে হবে। অতিরিক্ত চর্বি ও লবণযুক্ত খাবার এবং বাইরের খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমাতে হবে।
বিশেষ করে যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা হৃদ্রোগ রয়েছে, তাঁদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে। নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো জরুরি।
মনে রাখতে হবে, মিনি-স্ট্রোকের লক্ষণ সাময়িকভাবে সেরে গেলেও বিপদ কেটে গেছে—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই বড় ধরনের স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা
মুখের এক পাশ হঠাৎ বেঁকে যাওয়া, এক হাত বা পা অবশ বা দুর্বল হয়ে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির সমস্যা কিংবা ভারসাম্য হারানোর মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি করা যাবে না। লক্ষণ কয়েক মিনিট পর সেরে গেলেও জরুরি বিভাগে যেতে হবে। কারণ, শুরুতে মিনি-স্ট্রোক ও বড় স্ট্রোকের লক্ষণ আলাদা করে বোঝা কঠিন।