শ্রীমঙ্গলের সময়

তফসিল চান নেতারা, তবু কেন অনিশ্চয়তায় রাকসু নির্বাচন?

শিক্ষা · 2026-10-30T12:19:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

৩৫ বছর বিরতির পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বর্তমান কমিটির এক বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দ্রুত তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন রাকসুর বর্তমান নেতারা ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিরা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুকূলে এলেই নির্বাচন আয়োজন করা হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) সচল রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বর্তমান নেতৃত্ব। কিন্তু কমিটির এক বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও পরবর্তী নির্বাচন কবে হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে। ফলে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর চালু হওয়া ছাত্র সংসদের ধারাবাহিকতা নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দ্রুত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবি জানাচ্ছেন রাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধি ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা।

রাকসুর গঠনতন্ত্রে নির্বাচিত নির্বাহী কমিটির মেয়াদ দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে এক বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। সে হিসাবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবে নতুন নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, নির্বাচনের বিষয়টি প্রশাসনের বিবেচনায় রয়েছে। তবে উপযুক্ত পরিবেশ ও পরিস্থিতি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন আয়োজন করা হবে না।

গত বছরের জুলাইয়ে রাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রাথমিকভাবে সেপ্টেম্বরে ভোটগ্রহণের কথা থাকলেও কয়েক দফা পরিবর্তনের পর ১৬ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। নির্বাচনের আগে প্যানেলটির ২৪ দফা ইশতেহারে রাকসু নির্বাচন নিয়মিত আয়োজন ও ক্যালেন্ডারভুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও ছিল।

তবে পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনের প্রস্তুতি কত দূর এগিয়েছে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান। তিনি জানান, নতুন নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব উপাচার্যের। আগের নির্বাচনের প্রক্রিয়া, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং নির্বাচন আয়োজনের সময় যেসব সমস্যা হয়েছিল, সেসব তথ্য চেয়ে উপাচার্য তাঁর কাছে একটি ফাইল চেয়েছিলেন। প্রয়োজনীয় তথ্যসহ ফাইলটি তিনি জমা দিয়েছেন।

অধ্যাপক সেতাউর রহমানের ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে নির্বাচনের চাপ থাকায় বিষয়টি আলোচনায় রাখার জন্য তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে নির্বাচন আয়োজনের জন্য যে ধরনের বাস্তব প্রস্তুতি ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন, সেগুলো এখনো শুরু হয়েছে বলে তাঁর কাছে মনে হয়নি।

অন্যদিকে, রাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বলছেন, পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে তাঁরা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। রাকসুর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সালমান সাব্বির জানান, ছাত্র সংসদের কার্যক্রম যেন নিয়মিত চলে, সেটি তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এ বিষয়ে উপাচার্যকে জানিয়ে আসছেন তাঁরা।

সালমান সাব্বিরের দাবি, সর্বশেষ ৩০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত রাকসুর অধিবেশনে উপাচার্য নির্বাচনের তফসিল প্রণয়ন এবং গঠনতন্ত্র সংস্কারের বিষয়ে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমানকে দায়িত্ব দেন। প্রয়োজনীয় তথ্য হালনাগাদ করে দ্রুত জানাতেও তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয়। কোষাধ্যক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপের ঘোষণা আসতে পারে বলে আশা করছেন তিনি। এ বিষয়ে কোষাধ্যক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন বলেও জানান এজিএস।

রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারও ছাত্র সংসদ সচল রাখার বিষয়ে তাঁর অঙ্গীকারের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, রাকসু আদায় করে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন তিনি।

নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে প্রশাসনের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন রাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনের অন্যান্য কার্যক্রমে মনোযোগ থাকলেও রাকসু নির্বাচন নিয়ে তেমন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি সাধারণত তিন মাস আগে শুরু করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত সে ধরনের উদ্যোগ চোখে পড়েনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীরা চাইলে নির্বাচন হবে—এমন বক্তব্য দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীদের নির্বাচনের আগ্রহ আগের নির্বাচনেই স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতারাও রাকসু নির্বাচন অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মেহেদী সজীবের মতে, শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে রাকসু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় দ্রুত পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন তিনি। এ দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান।

শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল মিঠু বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে স্বাধীন মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ তৈরি হয়। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহাবস্থান এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামত তুলে ধরার জন্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন প্রয়োজন। অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুলের মতে, এবারের রাকসু শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করতে না পারলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে ছাত্র সংসদের প্রয়োজন রয়েছে। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা সচেতনভাবে প্রতিনিধি নির্বাচন করলে রাকসুর মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনের অবস্থান জানতে চাইলে রাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ছাত্র সংসদ ও নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে প্রশাসন ইতিবাচক। তবে শুধু কমিটির মেয়াদ শেষ হলেই নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব নয়। সামগ্রিক পরিবেশ ও পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে রাকসু নির্বাচন আয়োজন করা হবে।

এদিকে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নতুন নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাটছে না। প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং তফসিল ঘোষণার সময়ের দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন রাকসুর বর্তমান প্রতিনিধি ও ক্যাম্পাসের ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতারা।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত