শ্রীমঙ্গলের সময়

ডায়াবেটিস রোগীরা আমলকী খেতে পারবেন? যা বলছে গবেষণা

লাইফস্টাইল · 2026-11-01T03:00:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

ডায়াবেটিস রোগীরা পরিমিত পরিমাণে আমলকী খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। আমলকীতে থাকা ভিটামিন, আঁশ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের জন্য উপকারী। কিছু ক্লিনিক্যাল গবেষণায় আমলকীর নির্যাস গ্রহণের পর রক্তে শর্করার মাত্রা কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে গবেষণাগুলো সীমিত হওয়ায় আমলকীকে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা বা ওষুধের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাবার নির্বাচনে সতর্ক থাকতে হয়। কোন ফল খেলে রক্তে শর্করা বাড়বে, কোনটি তুলনামূলক নিরাপদ—এ নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন থাকে। এ ক্ষেত্রে আমলকী নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। ভিটামিন সি, আঁশ ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানসমৃদ্ধ এই ফলটি ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্যতালিকায় রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে কয়েকটি গবেষণাও হয়েছে।

গবেষণায় আমলকীর সম্ভাব্য উপকারিতার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও একে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের নিশ্চিত উপায় বলা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনা অনুযায়ী, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা ও ওষুধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা।

২০২৩ সালে ‘ডায়াবেটিস অ্যান্ড মেটাবলিক সিনড্রোম’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে আমলকী নিয়ে পাঁচটি র‍্যান্ডমাইজড নিয়ন্ত্রিত গবেষণার ফল বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, আমলকীর সাপ্লিমেন্ট গ্রহণকারীদের মধ্যে উপবাসের সময় রক্তে শর্করা, এলডিএল কোলেস্টেরল, মোট কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমার পাশাপাশি এইচডিএল কোলেস্টেরল বাড়ার ইঙ্গিত রয়েছে। শরীরের প্রদাহের একটি নির্দেশক সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিনের মাত্রাও কমেছিল।

তবে গবেষণাটির লেখকেরা জানিয়েছেন, অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ও গবেষণার সময়কাল সীমিত ছিল। বিভিন্ন গবেষণায় আমলকীর সাপ্লিমেন্টের পরিমাণ ও ব্যবহারের সময়ও এক ছিল না। তাই এসব ফল নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

এর আগে ২০১৩ সালে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওপর একটি নিয়ন্ত্রিত গবেষণা প্রকাশিত হয়। এতে ৮০ জন অংশগ্রহণকারী ১২ সপ্তাহ ধরে আমলকীর নির্যাস, অ্যাটোরভাস্টাটিন অথবা প্লাসিবো গ্রহণ করেন। গবেষণায় আমলকীর নির্যাস গ্রহণকারীদের রক্তে শর্করার দীর্ঘমেয়াদি নির্দেশক এইচবিএ১সি, রক্তের চর্বি এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের কিছু সূচকে উন্নতির কথা জানানো হয়। তবে এ গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছিল নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রস্তুত করা আমলকীর নির্যাস; সাধারণ কাঁচা আমলকী খাওয়ার ফলের সঙ্গে একে সরাসরি মিলিয়ে দেখা যায় না।

আমলকীতে থাকা ভিটামিন সি ও পলিফেনলের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। ফলের আঁশও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ। তবে এসব উপাদান থাকার অর্থ এই নয় যে আমলকী খেলেই ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়বে কিংবা রক্তে শর্করা দ্রুত কমে যাবে। আমলকী খেলে অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ সরাসরি উদ্দীপিত হয়—এমন দাবির পক্ষেও পর্যাপ্ত মানবভিত্তিক প্রমাণ নেই।

তাহলে ডায়াবেটিস রোগীরা কীভাবে আমলকী খাবেন? সাধারণভাবে চিনি বা মধু না মিশিয়ে গোটা ফল পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে। তবে কতটুকু খাবেন, তা নির্ভর করবে ব্যক্তির দৈনিক খাদ্যতালিকা, রক্তে শর্করার অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর। আমলকীর আচার, মোরব্বা, মিষ্টি মেশানো জুস বা বাজারের প্যাকেটজাত পানীয়তে বাড়তি চিনি থাকতে পারে। তাই এসব খাবার এড়িয়ে চলা বা লেবেল দেখে উপাদান যাচাই করা জরুরি।

গোটা ফল খাওয়াকে সাধারণত ফলের রস পান করার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ ফলের রসে আঁশ কমে যেতে পারে এবং অল্প সময়ে বেশি পরিমাণে পান করা সহজ হয়। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের নির্দেশিকায় ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্যতালিকায় গোটা ফল রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের জন্য ভেষজ বা খনিজ সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভর না করার কথা বলা হয়েছে।

ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন গ্রহণকারীদের জন্য আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আমলকী বা এর নির্যাস রক্তে শর্করার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা থাকলেও ব্যক্তিভেদে এর প্রভাব নিশ্চিত নয়। তাই নিয়মিত ওষুধ বা ইনসুলিনের সঙ্গে আমলকীর নির্যাস কিংবা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আমলকী খাওয়ার কারণে কোনোভাবেই ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন নিজে থেকে বন্ধ বা কমানো যাবে না।

সব মিলিয়ে, ডায়াবেটিস রোগীরা সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে পরিমিত আমলকী খেতে পারেন। তবে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে আমলকীর ওপর এককভাবে নির্ভর করার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই। নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ, সঠিক ওষুধ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত