পশ্চিমবঙ্গে ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে পুলিশের গুলিতে নিহত ২
বিশ্ব · 2026-10-28T14:05:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে পুলিশের গুলিতে দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। পৃথক দুটি ঘটনাকে পুলিশ ‘এনকাউন্টার’ বা বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে ঘটনাগুলো নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় মঙ্গলবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে। দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে একই দিন বেলা আড়াইটার দিকে। দুই ক্ষেত্রেই পুলিশের দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়।
গাইঘাটার ঘটনায় নিহত ব্যক্তির নাম প্রহ্লাদ দাস। তাঁর বয়স ২৩ বছর। স্থানীয় এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার পর গত শনিবার রাতে একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রী নিখোঁজ হয়। পরদিন প্রহ্লাদের বাড়ির পেছন থেকে ওই ছাত্রীর ক্ষতবিক্ষত ও নগ্ন মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে পরদিন প্রহ্লাদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার গভীর রাতে তাঁকে নিয়ে যাওয়ার পথে তিনি নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেন এবং শৌচকার্যের কথা বলে গাড়ি থামাতে বলেন। এ সময় এক পুলিশ কর্মকর্তার পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালান বলে অভিযোগ পুলিশের।
পুলিশ আরও দাবি করেছে, এ ঘটনায় একজন পুলিশকর্মী আহত হন এবং আরেকজন পাশের খালে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন। পরে পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে প্রহ্লাদের শরীরে তিনটি গুলি লাগে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
অন্য ঘটনাটি ঘটে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে। সেখানে সিআইডির গুলিতে নিহত হন ৪৬ বছর বয়সী সামিউল শেখ। বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডল হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন তিনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত আগস্টের শেষ দিকে সুজিত মণ্ডল নিখোঁজ হন। সেপ্টেম্বরের শুরুতে নদী থেকে তাঁর দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সুজিতকে হত্যা করে দেহ টুকরা টুকরা করে নদীতে ফেলে দেওয়ার কথা সামিউল স্বীকার করেছিলেন বলে সংবাদবিবরণে দাবি করা হয়েছে।
মামলাটির তদন্ত সিআইডির হাতে যাওয়ার পর সামিউলকে নিয়ে যাওয়ার সময় একই ধরনের ঘটনা ঘটে বলে পুলিশের দাবি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে সিআইডি গুলি চালায় এবং এতে তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনা দুটি নিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজ্য পুলিশের সদর দপ্তর ভবানী ভবনে বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, মাদক ব্যবসা ও নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ দমনে পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না বলেও জানান তিনি।
সামশেরগঞ্জের ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে দুই ঘটনার বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যের পাশাপাশি স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি উঠেছে।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস (এপিডিআর) গাইঘাটার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির বক্তব্য, গভীর রাতে প্রহ্লাদকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণে যাওয়া এবং তাঁর হাত খোলা রাখার বিষয়টি সন্দেহজনক। পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র কীভাবে ছিনিয়ে নেওয়া সম্ভব হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি।
এপিডিআর আরও প্রশ্ন করেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি পালানোর চেষ্টা করে থাকলে তাঁকে থামাতে প্রাণঘাতী গুলি চালানো কেন প্রয়োজন হয়েছিল। সংগঠনটির দাবি, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ হেফাজতে বন্দীর মৃত্যুর একাধিক ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে তারা।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই ঘটনাতেই অভিযুক্তরা আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনটি পুলিশের এই বিবরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে ঘটনাগুলোর প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।