ইরান সংঘাতের চাপে সংকটে মার্কিন নৌবাহিনী, জাহাজ মেরামতে লাগতে পারে কয়েক বছর!
মতামত · 2026-11-03T10:36:47.000000Z · সায়েম আহমেদ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এখন বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ সংকটের মুখে। যুদ্ধজাহাজের মেরামতের কাজ জমে যাওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই সংকট কাটিয়ে উঠতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘদিনের সামরিক তৎপরতা এবং ইরানকে ঘিরে সংঘাতের চাপ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।মার্কিন নৌবাহিনীর অপারেশন প্রধান অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল জানিয়েছেন, নৌবাহিনী জাহাজ মেরামতের কাজ জমে যাওয়ার গভীর সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত সমাধানের কোনো শর্টকাট বা বিকল্প পথ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটকে কেবল প্রযুক্তিগত দুর্বলতা কিংবা বাজেটের সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার সময় যুদ্ধজাহাজগুলোর অতিরিক্ত ব্যবহার এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
সাধারণত মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো নির্দিষ্ট সময়ের অভিযান শেষে বন্দরে ফিরে মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্রুদের বিশ্রামের সুযোগ পায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সামরিক পরিস্থিতিতে এই স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। সাত মাসের দায়িত্ব পালনের চক্র মাথায় রেখে পরিচালিত কিছু যুদ্ধজাহাজকে টানা ১০ থেকে ১৪ মাস পর্যন্ত অভিযানে নিয়োজিত থাকতে হয়েছে।
দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থানের ফলে জাহাজগুলোর যান্ত্রিক যন্ত্রাংশে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বন্দরে ফিরে আসার পর সেগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ মেরামতের কাজ জমা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান শিপইয়ার্ড, দক্ষ জনবল ও শিল্প অবকাঠামো দিয়ে এত বিপুল কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নিরাপদ বন্দরের সংকট বাড়িয়েছে চাপ
মার্কিন নৌবাহিনীর এই সংকটের পেছনে পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাহরাইন ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ইরানের হামলার পর ওই অঞ্চলে মার্কিন জাহাজগুলোর নিরাপদে অবস্থান ও রসদ সংগ্রহের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত দিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটির গুরুত্ব বেড়ে যায়। তবে অভিযানস্থল থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মাইল দূরে অবস্থিত এই ঘাঁটিতে যাতায়াত করতে জাহাজগুলোর দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়।
ফলে যুদ্ধজাহাজগুলোকে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান করতে হয়েছে। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বন্দরে অবস্থান করে যেসব জরুরি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা সম্ভব হতো, সেগুলোর অনেকটাই পিছিয়ে যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নতুন রেকর্ড
মার্কিন নৌবাহিনীর দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থানের বিষয়টি সামনে এসেছে দুটি ডেস্ট্রয়ারের অভিযানের মাধ্যমে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘স্প্রুয়্যান্স’ টানা ৩৪২ দিন সমুদ্রে অবস্থান করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের রেকর্ড ভেঙেছে। অন্যদিকে, ‘ম্যাকফল’ নামের আরেকটি ডেস্ট্রয়ার ৩৩২ দিন সমুদ্রে দায়িত্ব পালনের পর বন্দরে ফিরে আসে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় বন্দরের বাইরে অবস্থান করা শুধু যুদ্ধজাহাজের যান্ত্রিক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করে না, বরং নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, যন্ত্রাংশের ক্ষয় এবং ভবিষ্যৎ অভিযানের প্রস্তুতিকেও প্রভাবিত করে।
সংকট কাটিয়ে ওঠাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জমে থাকা মেরামতের কাজ দ্রুত শেষ করা। কিন্তু শিপইয়ার্ডের সীমিত সক্ষমতা, দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি, যন্ত্রাংশ সরবরাহের জটিলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
এ সংকট সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর সামরিক পরাজয়ের প্রমাণ নয়। তবে এটি দেশটির দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রস্তুতি এবং একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে শুধু উন্নত যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা সামরিক প্রযুক্তি থাকলেই যথেষ্ট নয়। এসব সামরিক সরঞ্জামকে দীর্ঘ সময় কার্যকর রাখার মতো রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো ও সক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানকে ঘিরে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মার্কিন নৌবাহিনীর এই পরিস্থিতি তাই ওয়াশিংটনের জন্য নতুন করে ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়, জমে থাকা মেরামতের কাজ শেষ করে যুক্তরাষ্ট্র কত দ্রুত তার নৌবাহিনীর স্বাভাবিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে পারে।