ফেসবুকের বিকল্প হতে চায় রংপুরের ফ্রিডার, ৫ মাসেই ১০ লাখ ব্যবহারকারী!
প্রযুক্তি · 2026-10-27T13:45:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
বাংলাদেশের দেশীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফ্রিডার পাঁচ মাসে ১০ লাখের বেশি নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর মাইলফলক অর্জন করেছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তা মো. আখতারুজ্জামান। প্ল্যাটফর্মটিতে প্রোফাইল ও পেজ ভেরিফিকেশন এবং মনিটাইজেশনের সুযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো, তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যবহারকারীদের আস্থা ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিড়ে বাংলাদেশেও তৈরি হচ্ছে নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। সেই লক্ষ্য নিয়ে রংপুর থেকে যাত্রা শুরু করা দেশীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ফ্রিডার’ পাঁচ মাসের মধ্যেই ১০ লাখের বেশি নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর মাইলফলক অর্জন করেছে বলে জানিয়েছেন এর উদ্যোক্তারা। তবে দ্রুত জনপ্রিয়তা বাড়লেও ব্যবহারকারীদের আস্থা ধরে রাখা, সার্ভারের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করাই এখন প্ল্যাটফর্মটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
‘স্বাধীনতা উপভোগ করুন ফ্রিডারের মধ্যে’—এই স্লোগান সামনে রেখে তৈরি প্ল্যাটফর্মটির উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের মানুষের গল্প, সংবাদ, মতামত ও সৃজনশীলতা প্রকাশের জন্য একটি নিজস্ব ডিজিটাল পরিসর গড়ে তোলা। পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে দেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সম্ভাবনাও দেখছেন উদ্যোক্তারা।
ফ্রিডারের উদ্যোক্তা মো. আখতারুজ্জামান জানান, ২০২৬ সালের ৭ মে যাত্রা শুরুর পর প্ল্যাটফর্মটি নিয়ে দেশ-বিদেশের ব্যবহারকারীদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনে ফ্রিডার নিয়ে প্রতিবেদন প্রচারের পর পরিচিতি আরও বেড়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি এবং প্রতিদিন নতুন করে প্রায় এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার ব্যবহারকারী নিবন্ধন করছেন।
ব্যবহারকারীর এই সংখ্যা দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোগটির জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও নিবন্ধিত অ্যাকাউন্টের সংখ্যা আর নিয়মিত সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক নয়। দীর্ঘমেয়াদে প্ল্যাটফর্মটির সাফল্য নির্ভর করবে মানুষ কতটা নিয়মিত এটি ব্যবহার করছেন, কনটেন্টের মান কেমন থাকছে এবং ব্যবহারকারীরা কতটা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন—এসব বিষয়ের ওপর।
ব্যবহারকারী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সার্ভারের সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নত করার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি, ভিডিও, বার্তা ও অন্যান্য কনটেন্ট আদান-প্রদানের জন্য পর্যাপ্ত সার্ভার, নির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্ক এবং কার্যকর তথ্য সংরক্ষণব্যবস্থা প্রয়োজন। ব্যবহারকারীর চাপ সামলাতে না পারলে অ্যাপ ধীর হয়ে যাওয়া, কনটেন্ট লোড হতে দেরি করা কিংবা সাময়িকভাবে সেবা ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই নতুন ব্যবহারকারী যুক্ত করার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রিডারের হেড অব সাপোর্ট রেজাউল করিমের মতে, এটি শুধু রংপুরের একটি উদ্যোগ নয়; বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে ফেসবুকের মতো প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা সহজ নয়। এসব প্রতিষ্ঠানের রয়েছে বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তি, উন্নত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের অর্জিত আস্থা। ফ্রিডারকে এগিয়ে নিতে হলে নিয়মিত প্রযুক্তি উন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদার, মানসম্মত কনটেন্ট এবং দ্রুত গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং ইতিবাচক ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করাকেও অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে প্ল্যাটফর্মটির সংশ্লিষ্টরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি ও বার্তা নিয়ে ব্যবহারকারীদের উদ্বেগ থাকে। তাই তথ্য কীভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়, কারা তা ব্যবহার করতে পারে এবং অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা জরুরি। ব্যবহারকারীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা থাকাও একটি প্ল্যাটফর্মের প্রতি আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
ফ্রিডারের মার্কেটিং প্রধান বাদশা আলম জানান, বাংলাভিশনে প্রতিবেদন প্রচারের পর প্ল্যাটফর্মটির পরিচিতি বেড়েছে। এখন নতুন ও পুরোনো ব্যবহারকারীদের জন্য সেবার মান উন্নত করা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো অন্যতম লক্ষ্য। ব্যবহারকারীদের আগ্রহকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপ দিতে পরিকল্পিত প্রচারণা ও উন্নত সেবার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কনটেন্ট নির্মাতা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করতে ফ্রিডারে অর্থ উপার্জনের সুযোগ রাখার কথাও জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৫০ টাকায় প্রোফাইল ভেরিফিকেশন এবং ৩০০ টাকায় পেজ ভেরিফিকেশনের সুবিধা রয়েছে। পাশাপাশি স্বল্প খরচে পোস্ট প্রচার, বিজ্ঞাপন এবং এক হাজার অনুসারী হলেই মনিটাইজেশনের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এসব সুবিধার যোগ্যতা, আয়ের হিসাব, অর্থ উত্তোলনের নিয়ম এবং প্রযোজ্য শর্ত ব্যবহারকারীদের আগে জেনে নেওয়া উচিত। মনিটাইজেশনের সুযোগ থাকলেই নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় নিশ্চিত হয় না; আয় নির্ভর করতে পারে প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা, কনটেন্ট ও অন্যান্য শর্তের ওপর।
দেশীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশে বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও সামনে এসেছে। ফ্রিডারের সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে সার্ভারের সক্ষমতা বাড়ানো ও নতুন সুবিধা যুক্ত করা সহজ হবে। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোগের বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য শুধু বিনিয়োগ নয়, কার্যকর ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং ব্যবহারকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ।
রংপুর নগরীর স্টাফ কোয়ার্টার-সংলগ্ন গঙ্গাচড়া সড়কের পাশে ভাড়া করা একটি ভবনে ফ্রিডারের প্রধান কার্যালয়। উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ১৫ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। একটি আঞ্চলিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থানের এই সম্ভাবনা দেশের অন্যান্য শহরের উদ্যোক্তাদের জন্যও উৎসাহের বিষয় হতে পারে।
ফ্রিডারের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যবহারকারীর আগ্রহকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপ দেওয়া যাবে। ব্যবহারকারীদের তথ্য সুরক্ষা, নিরবচ্ছিন্ন সেবা, মানসম্মত কনটেন্ট এবং মনিটাইজেশনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে প্ল্যাটফর্মটি দেশীয় ডিজিটাল অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার সুযোগ পেতে পারে। তবে ফেসবুক বা অন্য বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের বিকল্প হয়ে উঠতে হলে ধারাবাহিক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং ব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই।
রংপুর থেকে শুরু হওয়া ফ্রিডারের ১০ লাখ নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর মাইলফলক তাই একদিকে যেমন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে সামনে তুলে ধরছে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ। দেশীয় প্রযুক্তির এই উদ্যোগ কতটা এগোবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে সেবার মান, নিরাপত্তা, বিনিয়োগ এবং ব্যবহারকারীদের সন্তুষ্টি ধরে রাখার সক্ষমতার ওপর।