৫ হাজার টাকায় স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ সরকারের
প্রযুক্তি · 2026-10-27T14:32:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
দেশে ৪–৫ হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা। সরকারের লক্ষ্য, সাশ্রয়ী ডিভাইসের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো। তবে ফোনের নির্দিষ্ট মডেল, বৈশিষ্ট্য ও বাজারে সরবরাহের বিস্তারিত তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়।
স্মার্টফোন কিনতে আর হাজার হাজার টাকা খরচ করতে হবে না—এমন সম্ভাবনা তৈরি করতে দেশে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। লক্ষ্য, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, নিম্ন আয়ের পরিবারসহ যাঁরা বেশি দামের কারণে এখনো স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারছেন না, তাঁদের হাতে সাশ্রয়ী দামে ডিজিটাল প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া। তবে এই দামে ফোন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে কি না, কোন প্রতিষ্ঠান তৈরি করবে এবং ফোনের বৈশিষ্ট্য কী হবে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য জানা প্রয়োজন।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬’ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ উদ্যোগের কথা জানান তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা। তিনি বলেন, দেশের প্রান্তিক মানুষের ডিজিটাল সেবার আওতায় আসা নিশ্চিত করতে নেটওয়ার্ক উন্নয়নের পাশাপাশি সাশ্রয়ী স্মার্টফোনের দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু কম দামে একটি ফোন বিক্রি করা নয়; বরং সাধারণ মানুষকে ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া। স্মার্টফোন থাকলে কৃষকেরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ফসলের পরিচর্যা, সারের ব্যবহার ও বাজারদর সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেন। একইভাবে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অনলাইন শিক্ষা, চাকরির আবেদন, ডিজিটাল লেনদেন এবং সরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণের সুযোগ পান। তবে এসব সুবিধা বাস্তবে কাজে লাগাতে সাশ্রয়ী ফোনের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ ও কম খরচের ডেটা প্যাকেজও প্রয়োজন।
এর আগে সেপ্টেম্বরে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছিলেন, সরকার ও মোবাইল ফোন উৎপাদনকারীরা মিলে সাশ্রয়ী স্মার্টফোন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উৎপাদনকারীরা প্রতি ফোনে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে তিন মাসের জন্য বিনা মূল্যে ডেটা ও ভয়েস সেবা যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর কার্যকর ব্যয় আরও কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এসব সুবিধা চূড়ান্তভাবে কীভাবে কার্যকর হবে, তা সংশ্লিষ্ট ঘোষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সাশ্রয়ী স্মার্টফোন উৎপাদনের ক্ষেত্রে ফোনের যন্ত্রাংশের দাম, আমদানি শুল্ক, উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারজাতকরণের খরচ গুরুত্বপূর্ণ। ফোনের ডিসপ্লে, প্রসেসর, মাদারবোর্ড, ব্যাটারি ও কেসিংয়ের ব্যয় মিলিয়ে উৎপাদন খরচ নির্ধারিত হয়। সরকার ও উৎপাদনকারীরা এসব খরচ কমাতে পারলে তুলনামূলক কম দামে ফোন বাজারে আনা সম্ভব হতে পারে। তবে কম দাম নিশ্চিত করতে গিয়ে ফোনের মান, ব্যাটারির নিরাপত্তা, সফটওয়্যারের হালনাগাদ এবং বিক্রয়-পরবর্তী সেবার মানও বজায় রাখা জরুরি।
বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬ সম্মেলনে শুধু স্মার্টফোন উৎপাদন নয়, দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল পেতে পর্যাপ্ত কম্পিউটিং সক্ষমতা, উন্নত ডেটা অবকাঠামো, দক্ষ জনবল ও গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান বলেন, ডিজিটাল সক্ষমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় ১০ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে। ইন্টারনেট সংযোগের সুযোগ তৈরি হলেও সেটিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতে, ডিজিটাল রূপান্তর শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারকে স্বচ্ছ নীতিমালা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং বেসরকারি খাতকে উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে মানসম্মত সেবা পৌঁছে দিতে হবে।
সাশ্রয়ী ডিভাইসের পাশাপাশি স্থানীয় ভাষায় ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফাইবার অপটিক সংযোগ সম্প্রসারণ, নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানো এবং দুর্যোগের সময় দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ, কম দামে স্মার্টফোন হাতে পেলেও যদি ইন্টারনেট দুর্বল হয় কিংবা ডেটার খরচ বেশি থাকে, তাহলে অনেক ব্যবহারকারীর জন্য ডিজিটাল সেবা গ্রহণ কঠিনই থেকে যাবে।
সম্মেলনে হুয়াওয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট জেসন উ বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সরকার এবং শিল্পখাতের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সংযোগব্যবস্থা, ক্লাউড প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় হুয়াওয়ের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় শিল্পের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন সেবা উদ্ভাবনে অবদান রাখার কথা জানান তিনি। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উদ্যোগে এবং হুয়াওয়ের অংশীদারত্বে আয়োজিত সম্মেলনে দেশের ডিজিটাল রূপান্তর ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়।
তবে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার স্মার্টফোন কবে বাজারে পাওয়া যাবে এবং সেটিতে কী কী সুবিধা থাকবে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট মডেল, প্রসেসর, র্যাম, স্টোরেজ, ক্যামেরা, ব্যাটারি কিংবা বিক্রয়কেন্দ্র সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। একইভাবে ফোনের ঘোষিত মূল্য আর ভর্তুকি বা অপারেটরের সুবিধা পাওয়ার পর কার্যকর মূল্য এক নাও হতে পারে।
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্মার্টফোনের উচ্চমূল্যের কারণে ডিজিটাল সেবার বাইরে থাকা মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সাফল্য নির্ভর করবে ফোনের প্রকৃত দাম, মান, সহজলভ্যতা, ইন্টারনেট খরচ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিক্রয়-পরবর্তী সেবার ওপর। তাই সাশ্রয়ী স্মার্টফোন কেনার পরিকল্পনা থাকলে নির্দিষ্ট মডেল, মূল্য ও বাজারে সরবরাহের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ভালো।