শ্রীমঙ্গলের সময়

জলবায়ু পরিবর্তনে স্বাস্থ্য খাতে বছরে ২১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি, বরাদ্দ কত?

অর্থনীতি · 2026-10-28T13:20:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বছরে প্রায় ২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। গবেষণায় তাপজনিত কর্মঘণ্টা নষ্ট, ডেঙ্গুর ঝুঁকি, স্বাস্থ্য খাতে কম বরাদ্দ এবং অর্থ ব্যয়ের ঘাটতি তুলে ধরে ১২টি সুপারিশ করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বছরে প্রায় ২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। অথচ জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ মাত্র ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে ক্ষতির বড় অংশের সঙ্গে তাপের সম্পর্ক রয়েছে। মোট ক্ষতির ৯৮ শতাংশই তাপজনিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, কর্মঘণ্টা নষ্ট, তাপজনিত মৃত্যু এবং ডেঙ্গুর মতো রোগের ঝুঁকি—সব মিলিয়ে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

আগামী বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকায় আয়োজিত এক নীতি-সংলাপে গবেষণাটি উপস্থাপন করার কথা রয়েছে। নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি সেখানে প্রতিবেদনটি তুলে ধরবেন। মেলিওর ফাউন্ডেশন ও গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনস কাউন্সিলের সহায়তায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।

গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তাপের কারণে বাংলাদেশে ২৯ দশমিক ২৫ বিলিয়ন সম্ভাব্য কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। ১৯৯০ সালের তুলনায় এ পরিমাণ ২ দশমিক ৪ গুণ। নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টার ৬৪ শতাংশই কৃষি খাতের। এসব কর্মঘণ্টার অর্থনৈতিক মূল্য ১৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার বলে প্রতিবেদনে হিসাব করা হয়েছে।

তাপজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণার মডেলভিত্তিক হিসাবে, ২০২৩ সালে তাপের কারণে প্রায় ১৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর অর্থনৈতিক মূল্য ১ দশমিক ৪ থেকে ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দেশে তাপজনিত মৃত্যুর জন্য জাতীয় পর্যায়ে পৃথক নিবন্ধনব্যবস্থা নেই এবং জাতীয় হিট-হেলথ পরিকল্পনাও নেই বলে গবেষণায় বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে দেশে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার দিন ছিল ২৮টি, যা গত ৪৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ১৯৮০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রতি দশকে প্রায় শূন্য দশমিক ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে।

তাপমাত্রার সঙ্গে ডেঙ্গুর সম্পর্ক নিয়েও গবেষণায় তথ্য দেওয়া হয়েছে। ৬৪ জেলার দৈনিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্য জেলার তুলনায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ জেলায় ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১৮ থেকে ২৪ শতাংশ বেশি। তাপমাত্রার এই প্রভাবের সর্বোচ্চ মাত্রা দেখা যায় ১৪ থেকে ২১ দিন পর। অর্থাৎ আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে ডেঙ্গুর ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। গবেষণায় ২৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ডেঙ্গুর চিকিৎসা ও মৃত্যুর ক্ষেত্রেও অঞ্চলভেদে পার্থক্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুতে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের দুই-তৃতীয়াংশ ঢাকার বাইরে হলেও মৃত্যুর ৫৭ থেকে ৬৪ শতাংশ ঘটে ঢাকা শহরের হাসপাতালগুলোতে। প্রতি হাজার ভর্তি রোগীর বিপরীতে ঢাকার হাসপাতালে মৃত্যুর সংখ্যা ৮ থেকে ৯, অন্যদিকে অন্যান্য এলাকায় এ সংখ্যা ২ থেকে ৪ বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর নারীদের মৃত্যুঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় ১ দশমিক ৮ গুণ। ৬১ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মৃত্যুঝুঁকি শিশুদের তুলনায় ৪ দশমিক ৫ গুণ বলে গবেষণার হিসাবে উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু মোকাবিলার প্রস্তুতি ও অর্থায়নের ঘাটতিকেও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার ১১৩টি হস্তক্ষেপের মধ্যে মাত্র তিনটি সরাসরি স্বাস্থ্যসংক্রান্ত। জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের মাত্র শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ অর্থ গেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বিপরীতে প্রকৃত ব্যয়ের হারও ওঠানামা করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরাদ্দের ৩৮ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৫ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। শেষ অর্থবছরে ৫৯২ কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দের মধ্যে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩৭ কোটি টাকা বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৬ সালের মার্চে গৃহীত স্বাস্থ্য জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার (২০২৬–২০৩১) বাজেট তখনো প্রকাশিত হয়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

গবেষণায় স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের সামগ্রিক চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের চলতি স্বাস্থ্যব্যয়ের ৭৯ শতাংশ পরিবারগুলোকে বহন করতে হয়। অন্যদিকে জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ সরকারি স্বাস্থ্যব্যয়ে ব্যয় হয়।

বায়ুদূষণের প্রভাবও গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মডেলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কণাদূষণের কারণে দেশে প্রায় ২ লাখ ৬৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের গড় পিএম ২.৫-এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকার প্রায় ১৫ গুণ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব সমস্যা মোকাবিলায় গবেষণায় ১২টি সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৭ সালের গ্রীষ্মের আগে হিট-হেলথ অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন, বর্ষার আগে ডেঙ্গুর আগাম সতর্কতা চালু, জেলা হাসপাতালে গুরুতর ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং প্রতি তিন মাসে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ের তথ্য প্রকাশের প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কক্সবাজার, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও কুড়িগ্রামসহ ১৬টি অগ্রাধিকার জেলায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালুর প্রস্তাবও রয়েছে।

গবেষণার সুপারিশ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। তবে গবেষণায় উল্লিখিত ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানের বড় অংশ মডেলভিত্তিক হিসাবের ওপর নির্ভরশীল। তাই এগুলোকে সরাসরি নিবন্ধিত মৃত্যুর সংখ্যা বা সরকারি হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

তথ্যসূত্র: নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের গবেষণা প্রতিবেদন—প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত