শ্রীমঙ্গলের সময়

এমবাপ্পেকে ঘিরে উত্তেজনা, আর্থিক ক্ষতির ভয়ে লা লিগা

খেলা · 2026-10-29T12:25:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের কারণে চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাজার হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে স্প্যানিশ ফুটবলের শীর্ষ প্রতিযোগিতা লা লিগা। ফরাসি তারকাকে কেন্দ্র করে চীনে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার পর দেশটিতে স্প্যানিশ ফুটবলের সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার বন্ধ করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি এমবাপ্পের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠানও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এমন পরিস্থিতিতে লা লিগা কর্তৃপক্ষ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে তৎপর হয়েছে। কারণ, চীন শুধু স্প্যানিশ ফুটবলের বড় দর্শকবাজার নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্ব, বিজ্ঞাপন ও পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

বিতর্কের সূত্রপাত হয় এমবাপ্পের একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে। সেখানে চীনের সাবেক নেতা মাও সে তুংকে নিয়ে তাঁর মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর চীনের মানুষের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। বিষয়টি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা ছাড়িয়ে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। চীনের রাজনৈতিক ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে মন্তব্য দেশটিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে এমবাপ্পে নিজের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে তাঁর এই ক্ষমাপ্রার্থনার পরও বিতর্কের প্রভাব পুরোপুরি কেটে গেছে, এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।

বিতর্কের পর এমবাপ্পের সঙ্গে চীনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে পানীয় প্রস্তুতকারক ডংপেং এবং দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী মেংনিউয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জনপ্রিয় ফুটবলারদের সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চুক্তি বিজ্ঞাপন ও পণ্য বিপণনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমবাপ্পের মতো তারকার পরিচিতি ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের পণ্যের প্রচার করে থাকে। কিন্তু বিতর্কের কারণে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা বাণিজ্যিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই ঘটনা দেখিয়েছে, মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের প্রকাশ্য বক্তব্যও তাঁদের বাণিজ্যিক অবস্থানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

লা লিগার উদ্বেগের প্রধান কারণ চীনের বিশাল দর্শকগোষ্ঠী এবং সেখানে স্প্যানিশ ফুটবলের দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তা। রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার মতো ক্লাবের সমর্থক রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। চীনেও এই দুই ক্লাবের প্রতি আগ্রহ স্প্যানিশ লিগের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়াতে সাহায্য করেছে। সম্প্রচারস্বত্ব বিক্রি, বিজ্ঞাপন, পৃষ্ঠপোষকতা এবং ক্লাবের পণ্য বিপণনের মাধ্যমে এই জনপ্রিয়তা অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু কোনো বিতর্কের কারণে সম্প্রচার বন্ধ থাকলে দর্শকদের নিয়মিত ম্যাচ দেখার সুযোগ কমে যায়। দীর্ঘ সময় এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে দর্শকসংযোগ দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক চুক্তি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে লা লিগা কর্তৃপক্ষ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। স্প্যানিশ লিগের পক্ষ থেকে এমবাপ্পের বক্তব্যকে ব্যক্তিগত মন্তব্য হিসেবে আলাদা করে দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চীনের জনগণের প্রতি সম্মান জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদও এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে। লা লিগার জন্য কূটনৈতিক সম্পর্ক ও দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সমঝোতা কাজে লাগিয়ে উত্তেজনা কমানো গুরুত্বপূর্ণ। তবে ক্ষমাপ্রার্থনার পরই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সম্প্রচার কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক করা এবং চীনা দর্শক ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

চীনে এনবিএর অতীত অভিজ্ঞতা লা লিগার উদ্বেগকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে। ২০১৯ সালে হংকংয়ের প্রতিবাদ আন্দোলন নিয়ে এনবিএ দলের কর্মকর্তা ড্যারিল মোরের মন্তব্যের পর চীনে বাস্কেটবল প্রতিযোগিতাটির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২২ সালের মার্চে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এনবিএর ম্যাচ সম্প্রচার আবার শুরু হয়। এই ঘটনা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সঙ্গে কোনো দেশের বিরোধ তৈরি হলে তার প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। সম্প্রচার বন্ধ থাকা মানে শুধু দর্শকদের খেলা দেখা কমে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে বিজ্ঞাপন, পৃষ্ঠপোষকতা এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগও জড়িত। লা লিগা তাই একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতি এড়াতে আগ্রহী।

সব মিলিয়ে এমবাপ্পেকে ঘিরে বিতর্ক এখন লা লিগার জন্য মাঠের বাইরের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। চীনের বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে না পারলে স্প্যানিশ ফুটবলের আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ ও বাণিজ্যিক আয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ কত হবে, তা নির্ভর করবে সম্প্রচারসংক্রান্ত পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে কতটা অগ্রগতি ঘটে, তার ওপর। এমবাপ্পের ক্ষমাপ্রার্থনা, রিয়াল মাদ্রিদের অবস্থান এবং লা লিগার কূটনৈতিক উদ্যোগ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ। এখন দেখার বিষয়, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে চীনের দর্শক ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় কি না।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত