নিজেদের তৈরি স্পিন ফাঁদেই আটকে গেল বাংলাদেশ
খেলা · 2026-10-31T11:08:58.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
মিরপুরের স্পিনসহায়ক উইকেট তৈরি করে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত নিজেদের জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াল। নিজেদের তৈরি কন্ডিশনে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৮ উইকেটের বড় পরাজয় বরণ করতে হলো টাইগারদের। শনিবার (৩১ অক্টোবর) মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচে এই জয় তুলে নেয় ক্যারিবীয়রা। প্রথম ইনিংসে ২৭ রানের লিড নিয়েও ম্যাচ বাঁচাতে পারেনি বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১৪২ রানে অলআউট হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে ১৭০ রানের লক্ষ্য দাঁড় করায় স্বাগতিকরা। জবাবে মাত্র দুই উইকেট হারিয়েই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় সফরকারীরা।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে স্পিনের লড়াই হওয়ার প্রত্যাশা ছিল। মিরপুরের উইকেটে বল ঘুরবে, ব্যাটারদের জন্য রান করা কঠিন হবে, এমন পরিস্থিতি মাথায় রেখেই মাঠে নামে দুই দল। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ২৭২ রান সংগ্রহ করে। স্বাগতিকদের ব্যাটিংয়ে বড় সংগ্রহের ভিত গড়ার চেষ্টা থাকলেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা নিয়মিত বিরতিতে উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ক্যারিবীয়রাও খুব বেশি এগোতে পারেনি। তাদের প্রথম ইনিংস শেষ হয় ২৪৫ রানে। ফলে বাংলাদেশ ২৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড পায়। তখন পর্যন্ত ম্যাচে স্বাগতিকদের অবস্থান যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক ছিল। নিজেদের পরিচিত কন্ডিশন এবং স্পিনারদের কার্যকর ভূমিকার ওপর ভর করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সুযোগও ছিল তাদের সামনে।
তবে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমেই বাংলাদেশের সেই আশাবাদ দ্রুত হতাশায় পরিণত হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনারদের সামনে একের পর এক উইকেট হারাতে থাকে স্বাগতিকরা। ব্যাটারদের মধ্যে দায়িত্বশীলতার অভাব এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রোস্টন চেজ ও জোমেল ওয়ারিকান বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপকে কার্যত অচল করে দেন। চেজ একাই শিকার করেন পাঁচটি উইকেট। অন্যদিকে ওয়ারিকান নেন চার উইকেট। ফলে ২৭ রানের লিড নিয়ে শুরু করেও বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসে বড় কোনো সংগ্রহ দাঁড় করাতে পারেনি। মাত্র ৪৮.৪ ওভারে ১৪২ রানে গুটিয়ে যায় পুরো দল। এতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ১৭০ রান।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে সবচেয়ে উজ্জ্বল পারফরম্যান্স দেখান নাঈম হাসান। দলের নিয়মিত ব্যাটাররা যখন একের পর এক ব্যর্থ হচ্ছিলেন, তখন এক প্রান্ত আগলে রেখে লড়াই চালিয়ে যান এই অফ স্পিনার। ৯১ বলে ৫২ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন তিনি। চারটি চারের সাহায্যে সাজানো এই ইনিংসটি ছিল বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ। এটি ছিল নাঈমের টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতক। জাকের আলী করেন ২২ রান। কিন্তু অন্যদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা না পাওয়ায় নাঈমের লড়াই দলকে বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত রোস্টন চেজের বলে বড় শট খেলতে গিয়ে লং অনে ক্যাচ দিয়ে আউট হন নাঈম। তার বিদায়ের মধ্য দিয়ে ১৪২ রানে থামে বাংলাদেশের ইনিংস।
১৭০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটাররা শুরু থেকেই ইতিবাচক ক্রিকেট খেলেন। বাংলাদেশের স্পিনাররা উইকেট থেকে টার্ন ও বাউন্স আদায়ের চেষ্টা করলেও ক্যারিবীয় ওপেনারদের সামনে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি। জন ক্যাম্পবেল ও ব্র্যান্ডন কিং মিলে প্রথম উইকেটে ১১২ রানের জুটি গড়েন। এই জুটিই মূলত বাংলাদেশের ম্যাচে ফেরার সম্ভাবনা শেষ করে দেয়। ক্যাম্পবেল ৪৯ রান করে শরিফুল ইসলামের বলে বোল্ড হন। অন্যদিকে ব্র্যান্ডন কিং ছিলেন আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও আত্মবিশ্বাসী। তিনি ১১৫ বলে অপরাজিত ৮১ রান করেন। তার ইনিংসে ছিল একাধিক চার ও ছক্কার মার। পরে কেভেম হজকে সঙ্গে নিয়ে জয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন তিনি।
বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে শরিফুল ইসলাম ও হাসান মাহমুদ একটি করে উইকেট পেলেও ম্যাচের ফল পরিবর্তনের জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। ৩৫.১ ওভারে দুই উইকেট হারিয়ে ১৭০ রান তুলে নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কেভেম হজ ২৭ বলে অপরাজিত ৩১ রান করেন। ম্যাচে বল হাতে সবচেয়ে কার্যকর ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক রোস্টন চেজ। প্রথম ইনিংসে ৪৩ রানে অপরাজিত থাকার পাশাপাশি দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। অন্যদিকে জোমেল ওয়ারিকান পুরো ম্যাচে নয়টি উইকেট শিকার করে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতেন। বাংলাদেশের স্পিনাররা নিজেদের কন্ডিশনে প্রত্যাশিত প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও ক্যারিবীয় স্পিনাররা ঠিকই সেই সুযোগ কাজে লাগান।
এই পরাজয়ের ফলে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। একই সঙ্গে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকায়ও বড় ধাক্কা খেল বাংলাদেশ। ম্যাচের আগে ৫৫.৫৬ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে অবস্থান করা দলটির পয়েন্টের হার নেমে এসেছে ৪২.৮৬ শতাংশে। এতে তালিকায় পঞ্চম স্থানে নেমে গেছে টাইগাররা। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টানা তৃতীয় টেস্ট পরাজয়ও এটি। এই ফলাফল বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি ম্যাচের হার নয়, বরং নিজেদের কন্ডিশন ও উইকেট পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবার বড় বার্তা। স্পিননির্ভর উইকেট তৈরি করলেই যে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করা যায় না, মিরপুরের এই ম্যাচে তারই প্রমাণ মিলেছে। সিরিজে সমতা ফেরাতে পরের টেস্টে ব্যাটিংয়ের ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি বোলিং পরিকল্পনাতেও কার্যকর পরিবর্তন আনতে হবে বাংলাদেশকে।