বিটিআরসির ঘরে ঘরে মোবাইল সিগন্যাল উন্নত করার উদ্যোগ
প্রযুক্তি · 2026-10-26T04:00:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতা ও সেবার মান উন্নত করতে ৮ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ E-GSM স্পেকট্রাম নিলামে তোলার প্রস্তাব করেছে বিটিআরসি। দুটি ব্লকের ভিত্তিমূল্য যথাক্রমে প্রতি মেগাহার্টজ ২১৪ কোটি ও ১৭৮ কোটি টাকা নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের অনুমোদন, নিলামের চূড়ান্ত নিয়ম এবং অপারেটরদের বিনিয়োগের ওপর এ উদ্যোগের বাস্তব ফল নির্ভর করবে।
দেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতা বাড়ানো, দুর্বল সিগন্যালের সমস্যা কমানো এবং ঘর ও অফিসের ভেতরে নির্ভরযোগ্য সংযোগ নিশ্চিত করতে নিম্ন ব্যান্ডের স্পেকট্রাম নিলামে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এ উদ্যোগের আওতায় ৮ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ E-GSM স্পেকট্রাম নিলামে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত স্পেকট্রামের দুটি ব্লকের জন্য আলাদা ভিত্তিমূল্য নির্ধারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ৩ দশমিক ৪ মেগাহার্টজের একটি ব্লকের ভিত্তিমূল্য প্রতি মেগাহার্টজ ২১৪ কোটি টাকা এবং ৫ মেগাহার্টজের অন্য ব্লকের ভিত্তিমূল্য প্রতি মেগাহার্টজ ১৭৮ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। ১২ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিলামের আগে এসব ভিত্তিমূল্যের বিষয়ে সরকারের অনুমোদন নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত মূল্য এখনো চূড়ান্ত নয়। সরকারের অনুমোদন ও নিলামের নিয়ম চূড়ান্ত হওয়ার পরই এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানা যাবে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যান্ডের মোট ১০ মেগাহার্টজের মধ্যে ১ দশমিক ৬ মেগাহার্টজ আগে রবি আজিয়াটা পিএলসিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট ৮ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ নিলামে তোলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ৩ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ ব্লকের জোড়া ফ্রিকোয়েন্সি ৮৮৫ থেকে ৮৮৮ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ এবং ৯৩০ থেকে ৯৩৩ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ। অন্যদিকে, ৫ মেগাহার্টজ ব্লকের জোড়া ফ্রিকোয়েন্সি ৮৮০ থেকে ৮৮৫ মেগাহার্টজ এবং ৯২৫ থেকে ৯৩০ মেগাহার্টজ।
প্রস্তাবিত দুই ব্লকের ভিত্তিমূল্য প্রতি মেগাহার্টজ ২৩৭ কোটি টাকার বেঞ্চমার্ক মূল্যের চেয়ে কম রাখা হয়েছে। ৩ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ ব্লকের ভিত্তিমূল্য বেঞ্চমার্কের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ এবং ৫ মেগাহার্টজ ব্লকের ভিত্তিমূল্য প্রায় ২৫ শতাংশ কম। ফ্রিকোয়েন্সির ব্যবহার, সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রতিবেশী দেশের সিগন্যালের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ এবং স্পেকট্রাম ব্যবহারের মেয়াদের মতো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এ মূল্য প্রস্তাব করা হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
স্পেকট্রামের ভিত্তিমূল্য হলো নিলামে অংশগ্রহণের প্রাথমিক মূল্য। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে চূড়ান্ত মূল্য এর চেয়ে বেশি হতে পারে। আবার নিলামে কোন অপারেটর অংশ নেবে, কতটুকু স্পেকট্রাম বরাদ্দ পাবে এবং শেষ পর্যন্ত কত টাকা ব্যয় হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এসব বিষয় নিলামের চূড়ান্ত নিয়ম ও ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।
মোবাইল নেটওয়ার্কের মান উন্নয়নে নিম্ন ব্যান্ডের স্পেকট্রাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সাধারণভাবে নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ তুলনামূলক বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে এবং ভবনের দেয়ালসহ বিভিন্ন বাধা ভেদ করে সংকেত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সুবিধা দেয়। এ কারণে এ ধরনের স্পেকট্রাম ব্যবহার করে গ্রামাঞ্চল, প্রত্যন্ত এলাকা এবং ঘরের ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনো দুর্বল সিগন্যাল, কলের মানের সমস্যা এবং ভবনের ভেতরে ইন্টারনেট সংযোগ পেতে অসুবিধার অভিযোগ রয়েছে। নতুন স্পেকট্রাম যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে এসব সমস্যার কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হতে পারে। তবে শুধু স্পেকট্রাম বরাদ্দের মাধ্যমে সব এলাকায় একই ধরনের সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। টাওয়ারের অবস্থান, নেটওয়ার্কের অবকাঠামো, ব্যাকহল সংযোগ, গ্রাহকের চাপ এবং অপারেটরদের বিনিয়োগের ওপরও সেবার মান নির্ভর করে।
গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিম্ন ব্যান্ডের স্পেকট্রাম তুলনামূলক বড় এলাকায় সংকেত পৌঁছাতে সহায়তা করতে পারে। ফলে অপারেটররা এটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারলে নতুন এলাকায় নেটওয়ার্কের আওতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর মাধ্যমে অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল লেনদেন, কৃষিবিষয়ক তথ্য সংগ্রহ এবং সরকারি ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে মানুষের সুবিধা বাড়তে পারে। তবে এসব সুবিধা নিশ্চিত করতে অপারেটরদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে।
স্পেকট্রাম বরাদ্দের ক্ষেত্রে সীমান্তবর্তী এলাকার ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে আসা সংকেতের কারণে নির্দিষ্ট এলাকায় একই বা কাছাকাছি ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহারে হস্তক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে নিলামের আগে ফ্রিকোয়েন্সির প্রযুক্তিগত ব্যবহার, সম্ভাব্য সংকেতের সংঘাত এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। প্রস্তাবিত দুই ব্লকের ভিত্তিমূল্যে পার্থক্যের পেছনেও এ ধরনের প্রযুক্তিগত বিবেচনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত স্পেকট্রাম বরাদ্দ ২০৩০ সাল পর্যন্ত কার্যকর রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে স্পেকট্রাম ৮৫০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে স্থানান্তরের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন, কারিগরি প্রস্তুতি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হবে।
নিলামের ভিত্তিমূল্য অনুমোদনের পাশাপাশি এর বিস্তারিত নিয়ম তৈরির কাজও রয়েছে। নিলামে অংশগ্রহণের শর্ত, দর বৃদ্ধির ধাপ, লাইসেন্সের মেয়াদ, অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি, আবেদন ফি, জামানত এবং বার্ষিক স্পেকট্রাম চার্জের মতো বিষয় চূড়ান্ত নিয়মে নির্ধারিত হতে পারে। এসব শর্ত প্রকাশের পর অপারেটররা নিলামে অংশগ্রহণ ও বিনিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
নতুন স্পেকট্রাম বরাদ্দের ফলে ইন্টারনেটের গতি বাড়বে কি না, কিংবা ডেটা প্যাকের দাম কমবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। অতিরিক্ত স্পেকট্রাম নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। তবে ইন্টারনেটের গতি নির্ভর করে ব্যবহৃত প্রযুক্তি, টাওয়ারের সক্ষমতা, নেটওয়ার্কে গ্রাহকের চাপ এবং সংযোগ অবকাঠামোর ওপর। একইভাবে ডেটা প্যাকের মূল্য নির্ভর করবে অপারেটরদের ব্যয়, বাজারের প্রতিযোগিতা ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের ওপর।
সব মিলিয়ে, নিম্ন ব্যান্ডের ৮ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ E-GSM স্পেকট্রাম নিলামে তোলার প্রস্তাব দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এর বাস্তব সুফল নির্ভর করবে সরকারের অনুমোদন, নিলামের চূড়ান্ত নিয়ম, স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগের ওপর। নিলাম সম্পন্ন হওয়ার পর গ্রাহকরা বাস্তবে কতটা উন্নত সেবা পাচ্ছেন, তা বোঝার জন্য নেটওয়ার্কের আওতা, কলের মান ও ইন্টারনেট সংযোগের স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।