শ্রীমঙ্গলের সময়

সকাল শুরু করার আগে যে দোয়াগুলো জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

ধর্ম · 2026-10-28T00:14:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

সকাল শুরু করার আগে আল্লাহকে স্মরণ করার জন্য ঘুম থেকে ওঠার দোয়া, সকাল-সন্ধ্যার জিকির এবং সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠের গুরুত্ব রয়েছে। মহানবী (সা.)-এর শেখানো এসব দোয়া ও আমলের আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ এবং নির্ভরযোগ্য হাদিসের সূত্র জেনে নিন।

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর অনেকেই দিনের ব্যস্ততায় জড়িয়ে পড়েন। কেউ কর্মস্থলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন, কেউ পরিবারের কাজে ব্যস্ত হন, আবার কেউ পড়াশোনা কিংবা জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু দিনের শুরুতেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া ও জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করার অভ্যাস একজন মুসলমানের জীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ইসলামি শিক্ষায় আল্লাহর প্রশংসা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহতে ঘুম থেকে জেগে ওঠার দোয়া, সকাল-সন্ধ্যার জিকির এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করার শিক্ষা রয়েছে। এসব দোয়া শুধু মুখে উচ্চারণের বিষয় নয়; বরং এগুলোর অর্থ বোঝা এবং জীবনে তার শিক্ষা ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সব দোয়া একই সময়ে বা একই নিয়মে পড়তে হয়, এমন নয়। কিছু দোয়া ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে সম্পর্কিত, কিছু সকাল-সন্ধ্যার জিকিরের অন্তর্ভুক্ত, আবার কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পড়া হয়।

ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর প্রথমেই যে দোয়াটি পড়া যায়, সেটি সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে। হজরত হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) ঘুম থেকে জেগে আল্লাহর প্রশংসা করে বলতেন, “আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আহইয়ানা বা‘দা মা আমাতানা, ওয়া ইলাইহিন নুশূর।” দোয়াটির আরবি হলো, الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ। এর বাংলা অর্থ, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের মৃত্যুর মতো নিদ্রার পর আবার জীবিত করেছেন। আর তাঁর কাছেই আমাদের পুনরুত্থান। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩১২)। এই দোয়া নতুন দিনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

সকালে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হলো দিনের শুরুতে বরকত ও উপকারী জ্ঞান প্রার্থনা করা। মহানবী (সা.) উম্মতের জন্য সকালবেলায় বরকতের দোয়া করেছেন। হাদিসে এসেছে, “আল্লাহুম্মা বারিক লি উম্মাতি ফি বুকুরিহা”—অর্থাৎ, হে আল্লাহ, আমার উম্মতের জন্য তাদের দিনের শুরুর সময়ে বরকত দান করুন। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৬০৬; জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ১২১২)। এই বর্ণনা থেকে দিনের শুরুতে সময়কে কাজে লাগানো এবং কল্যাণকর কাজে মনোযোগী হওয়ার শিক্ষা পাওয়া যায়।

সকাল-সন্ধ্যার জিকিরের মধ্যে সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। হাদিসে সকাল ও সন্ধ্যায় এই তিনটি সুরা তিনবার পাঠ করার নির্দেশনা বর্ণিত হয়েছে। সুরাগুলোতে আল্লাহর একত্ব ঘোষণা, সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া এবং কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনার শিক্ষা রয়েছে। এগুলোর আরবি পাঠ ও অর্থ বুঝে নিয়মিত পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৫০৮২; জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৫৭৫)।

আরেকটি সকালবেলার দোয়া বর্ণিত হয়েছে জামে আত-তিরমিজিতে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) তাঁর সাহাবিদের সকাল ও সন্ধ্যায় আল্লাহকে স্মরণ করার এই দোয়া শেখাতেন। আরবি পাঠ হলো, اللَّهُمَّ بِكَ أَصْبَحْنَا وَبِكَ أَمْسَيْنَا وَبِكَ نَحْيَا وَبِكَ نَمُوتُ وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ। বাংলা উচ্চারণ, “আল্লাহুম্মা বিকা আসবাহনা, ওয়া বিকা আমসাইনা, ওয়া বিকা নাহইয়া, ওয়া বিকা নামূতু, ওয়া ইলাইকাল মাসীর।” এর অর্থ, হে আল্লাহ, আপনারই অনুগ্রহে আমরা সকালে উপনীত হই, আপনারই অনুগ্রহে সন্ধ্যায় উপনীত হই, আপনারই নির্দেশে আমরা জীবিত থাকি ও মৃত্যুবরণ করি এবং আপনার কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন। (জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৩৯১)।

সকালে আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা ও কল্যাণ চাওয়ার পাশাপাশি নিজের কাজকর্মে তাঁর ওপর ভরসা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুসলমান দিনের পরিকল্পনা করবেন, নিজের দায়িত্ব পালন করবেন এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর সাহায্য চাইবেন। দোয়া পড়ার পাশাপাশি সত্য কথা বলা, মানুষের অধিকার রক্ষা করা, হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা এবং সময়ের সদ্ব্যবহার করাও ইসলামি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সকালবেলার আমল শুরু করার জন্য অনেক দোয়া একসঙ্গে মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। প্রথমে ঘুম থেকে ওঠার দোয়া শিখে নেওয়া যায়। এরপর ধীরে ধীরে সকাল-সন্ধ্যার জিকির এবং সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। বাংলা উচ্চারণ শেখার সহায়ক হলেও আরবি শুদ্ধভাবে পড়ার চেষ্টা করা উচিত। দোয়ার অর্থ বুঝে পাঠ করলে তা কেবল মুখস্থ বাক্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, নির্ভরতা ও আখিরাতের স্মরণকে আরও অর্থবহ করে তোলে।

ইসলামি দোয়া ও জিকিরের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য হাদিসের সূত্র যাচাই করা জরুরি। কোনো দোয়া পড়লে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ, সাফল্য কিংবা বিপদমুক্তি নিশ্চিত হবে—এমন দাবি করার আগে তার প্রামাণিকতা যাচাই করতে হবে। মহানবী (সা.)-এর শেখানো দোয়াগুলো যথাসম্ভব শুদ্ধভাবে শেখা, অর্থ বোঝা এবং জীবনে তার শিক্ষা অনুসরণ করাই হওয়া উচিত একজন মুসলমানের লক্ষ্য। দিনের শুরুতে আল্লাহকে স্মরণ করার এই অভ্যাস ব্যস্ত জীবনের মধ্যেও ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত