কারা আয়কর রিটার্ন দিতে বাধ্য, আর কারা ছাড় পাবেন? জেনে নিন নিয়ম
অর্থনীতি · 2026-10-26T09:44:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
২০২৬–২৭ করবর্ষে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক কি না, তা নির্ভর করে করযোগ্য আয়, পেশা, পূর্ববর্তী কর-সংক্রান্ত ইতিহাস এবং নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণের শর্তের ওপর। আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা দিতে হতে পারে। আবার অনলাইনে রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় পাওয়া মানেই রিটার্ন দাখিলের মূল বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় পাওয়া নয়।
বাংলাদেশে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া নিয়ে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার, বাড়িওয়ালা ও নতুন TIN-ধারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে যাঁদের আয় কম, তাঁদের অনেকেই মনে করেন আয়কর দিতে না হলে রিটার্ন জমা দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। আবার অনেকে মনে করেন, একবার ই-টিআইএন (e-TIN) খুললেই প্রতিবছর একই নিয়মে রিটার্ন জমা দিতে হয়।
বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। বাংলাদেশের আয়কর আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নির্ভর করে তাঁর মোট আয়, পেশা, আগের বছরের কর-সংক্রান্ত অবস্থা এবং নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শর্তের ওপর। ফলে আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেও কোনো কোনো ব্যক্তিকে রিটার্ন জমা দিতে হতে পারে। অন্যদিকে, অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় পাওয়া এবং সব ধরনের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় পাওয়া এক বিষয় নয়।
২০২৬–২৭ করবর্ষে কারা আয়কর রিটার্ন জমা দিতে বাধ্য, কারা ছাড় পেতে পারেন, TIN থাকলে কী করণীয়, চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে কোন নিয়ম প্রযোজ্য এবং অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে কারা অব্যাহতি পেয়েছেন—এসব বিষয় সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।
আয়কর রিটার্ন কী এবং কেন জমা দিতে হয়?
আয়কর রিটার্ন হলো নির্দিষ্ট আয়বর্ষে একজন করদাতার আয় এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্পদ, দায়, বিনিয়োগ ও পরিশোধিত করের তথ্য নির্ধারিত নিয়মে আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করার বিবরণী। এর মাধ্যমে করদাতা নিজের আর্থিক তথ্য ঘোষণা করেন এবং আইন অনুযায়ী প্রযোজ্য করের হিসাব উপস্থাপন করেন।
আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া এবং আয়কর পরিশোধ করা আলাদা বিষয়। কোনো ব্যক্তির প্রদেয় আয়কর শূন্য হতে পারে, কিন্তু আইন অনুযায়ী তাঁর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হতে পারে। আবার কারও আয় করযোগ্য সীমা অতিক্রম করলে তাঁর করের হিসাব নির্ধারণ করতে হবে এবং প্রযোজ্য নিয়মে কর পরিশোধ করতে হতে পারে।
তাই শুধু আয়কর দিতে হবে কি না, সেটি বিবেচনা করে রিটার্ন জমার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। প্রথমে জানতে হবে, সংশ্লিষ্ট করবর্ষে তাঁর জন্য রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক কি না।
২০২৬–২৭ করবর্ষে করমুক্ত আয়ের সীমা কত?
২০২৬–২৭ ও ২০২৭–২৮ করবর্ষের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রকাশিত বাজেট দলিলে ব্যক্তি করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। করদাতার শ্রেণি অনুযায়ী সীমা ভিন্ন হতে পারে।
করদাতার শ্রেণি
করমুক্ত আয়ের সীমা
সাধারণ ব্যক্তি করদাতা
৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা
নারী করদাতা
৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা
৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী করদাতা
৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা
প্রতিবন্ধী ব্যক্তি করদাতা
৫ লাখ টাকা
তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা
৫ লাখ টাকা
গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা
৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা
গেজেটভুক্ত আহত জুলাই যোদ্ধা
৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা
প্রতিবন্ধী সন্তান বা পোষ্যের পিতা-মাতা কিংবা আইনগত অভিভাবকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে অতিরিক্ত করমুক্ত সীমার সুবিধা প্রযোজ্য হতে পারে। তবে এ ধরনের সুবিধা দাবি করার আগে সংশ্লিষ্ট করবর্ষের নির্দেশিকা অনুযায়ী যোগ্যতা ও শর্ত যাচাই করতে হবে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, করমুক্ত সীমা মূলত কর নির্ধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি একাই নির্ধারণ করে না যে একজন ব্যক্তিকে রিটার্ন জমা দিতে হবে কি না। আয় কম হলেও আইনগত বাধ্যবাধকতা বা নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণের শর্তের কারণে রিটার্ন প্রয়োজন হতে পারে।
কারা আয়কর রিটার্ন জমা দিতে বাধ্য?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়করসংক্রান্ত সরকারি FAQ-তে আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হওয়ার বিভিন্ন পরিস্থিতি উল্লেখ রয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শ্রেণি নিচে তুলে ধরা হলো।
১. যাঁদের আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে
কোনো ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট করবর্ষের মোট আয় তাঁর জন্য প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে শুধু মূল বেতন বিবেচনা করলেই হবে না। বেতন, বাড়িভাড়া, ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, ব্যাংক সুদ এবং অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া আয় প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী হিসাব করতে হবে।
২. আগের তিন বছরের মধ্যে কর নির্ধারণ বা করযোগ্য আয় থাকলে
আয়বর্ষের আগের তিন বছরের যেকোনো বছরে কোনো ব্যক্তির কর নির্ধারণ হয়ে থাকলে বা তাঁর আয় করযোগ্য হয়ে থাকলে পরবর্তী রিটার্নের বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে।
তাই বর্তমান বছরে আয় কমে গেলেও আগের বছরের কর-সংক্রান্ত ইতিহাস যাচাই করা জরুরি।
৩. অংশীদারি ফার্মের অংশীদার হলে
কোনো ব্যক্তি অংশীদারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অংশীদার হলে তাঁর ব্যক্তিগত রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। শুধু ব্যক্তিগত বেতন বা অন্য আয় কম হওয়ার কারণে এ ধরনের বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করা উচিত নয়।
৪. কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী হলে
কোনো কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী রিটার্ন জমা দিতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু পদবি নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত অবস্থান ও আইনি শর্তও গুরুত্বপূর্ণ।
৫. সরকারি কর্মচারী হলে
সরকারি কর্মচারীদের জন্য রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই তাঁদের আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেও শুধু সেই কারণে রিটার্নের প্রয়োজন নেই বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
৬. ব্যবসা বা পেশায় নির্বাহী কিংবা ব্যবস্থাপনা পদে বেতনভোগী কর্মী হলে
কোনো ব্যবসা বা পেশায় নির্বাহী কিংবা ব্যবস্থাপনা পদে বেতনভোগী কর্মীর ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।
এ কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেই সবাই একই নিয়মের আওতায় পড়বেন, এমন নয়। সাধারণ কর্মচারী, নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পদে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তাঁদের দায়িত্ব এবং আইনের শর্ত বিবেচনা করতে হবে।
৭. কর অব্যাহতি পাওয়া বা হ্রাসকৃত হারে করযোগ্য আয় থাকলে
কোনো আয় কর অব্যাহতি পাওয়া বা হ্রাসকৃত হারে করযোগ্য হলেই রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যায় না। সংশ্লিষ্ট আইনে রিটার্ন জমার শর্ত থাকলে তা পালন করতে হবে।
আয় কম হলেও কোন কোন ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা দিতে হতে পারে?
কিছু নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণ, লাইসেন্স, নিবন্ধন বা আর্থিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ প্রয়োজন হতে পারে। ফলে করযোগ্য আয় না থাকলেও কোনো ব্যক্তি এসব শর্তের আওতায় পড়তে পারেন।
উদাহরণ হিসেবে, নির্দিষ্ট অঙ্কের ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ বা নবায়ন, আমদানি-রপ্তানি নিবন্ধন, নির্দিষ্ট সম্পত্তি নিবন্ধন, ক্রেডিট কার্ড গ্রহণ বা বহাল রাখা এবং নির্দিষ্ট পেশাগত লাইসেন্সের ক্ষেত্রে রিটার্নের প্রমাণ প্রয়োজন হতে পারে।
তবে এসব ক্ষেত্রে সব ব্যক্তি বা সব লেনদেনের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ঋণের অঙ্ক, সম্পত্তির অবস্থান, সেবার ধরন এবং সংশ্লিষ্ট আইনে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা যাচাই করতে হবে।
বিশেষ করে জমি, ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনাবেচা, মোটরযানের নিবন্ধন, নির্দিষ্ট সঞ্চয়পত্র বা আর্থিক হিসাব এবং সরকারি বা পেশাগত অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো।
শুধু TIN থাকলেই কি প্রতিবছর রিটার্ন দিতে হবে?
ই-টিআইএন বা TIN হলো করদাতাকে শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত নিবন্ধন নম্বর। TIN থাকা, আয়কর পরিশোধ করা এবং রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা—এগুলো আলাদা বিষয়।
কোনো ব্যক্তির TIN থাকলেও তাঁর আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকতে পারে। কিন্তু তিনি যদি সরকারি কর্মচারী, কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক, নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা পদে বেতনভোগী কর্মী কিংবা অন্য কোনো বাধ্যতামূলক শ্রেণিতে পড়েন, তাহলে রিটার্ন জমা দিতে হতে পারে।
আবার TIN নেওয়ার পর আয় বন্ধ হয়ে গেলে বা ভবিষ্যতে TIN-এর প্রয়োজন না থাকলে নম্বরটি নিজে থেকে বাতিল হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে প্রযোজ্য নিয়ম জানতে হবে।
অর্থাৎ, শুধু TIN থাকার কারণে সব পরিস্থিতিতে একই সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। ব্যক্তির আয়, পেশা, আগের কর-সংক্রান্ত ইতিহাস এবং রিটার্ন জমার অন্যান্য শর্ত যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
কারা অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়া থেকে ছাড় পাবেন?
২০২৬–২৭ করবর্ষে স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনায় কয়েকটি শ্রেণির করদাতাকে এ বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, নিচের ব্যক্তিরা অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় পেয়েছেন:
১. ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ করদাতা: তাঁরা ইচ্ছা করলে অনলাইনেও রিটার্ন দিতে পারবেন।
২. শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতা: তাঁদের ক্ষেত্রে অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
৩. বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতা: বিদেশে থাকার কারণে তাঁরা অনলাইন রিটার্নের বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড়প্রাপ্ত শ্রেণিতে পড়েন।
৪. মৃত করদাতার পক্ষে আইনগত প্রতিনিধি: মৃত ব্যক্তির পক্ষে আইনগত প্রতিনিধি রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে অনলাইন বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পান।
তবে এই ছাড়ের অর্থ এই নয় যে তাঁদের সবার আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তাঁদের আয়, আগের কর-সংক্রান্ত ইতিহাস এবং অন্যান্য আইনগত শর্ত অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের প্রয়োজনীয়তা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।
অনলাইন সিস্টেমে নিবন্ধনসংক্রান্ত সমস্যার কারণে রিটার্ন জমা দিতে না পারলেও নিজে থেকে কাগজে রিটার্ন জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনারের কাছে আবেদন এবং প্রযোজ্য অনুমোদন নিতে হতে পারে।
আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে কী হতে পারে?
আইন অনুযায়ী রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও তা জমা না দিলে প্রযোজ্য বিধান অনুসারে জরিমানা বা অন্যান্য কর-সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত কর বা অন্য আইনগত ব্যবস্থা প্রযোজ্য হতে পারে।
তবে জরিমানার পরিমাণ সবার জন্য এক নয়। করদাতার অবস্থা, রিটার্ন জমার সময়, আগের কর-সংক্রান্ত ইতিহাস এবং প্রযোজ্য আইনের ধারার ওপর তা নির্ভর করে।
তাই রিটার্ন দিতে হবে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ থাকলে শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আগেই যাচাই করা উচিত। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে কীভাবে রিটার্ন জমা দিতে হবে এবং অতিরিক্ত অর্থ প্রযোজ্য হবে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী জানতে হবে।
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেবেন যেভাবে
যাঁদের রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক, তাঁরা এনবিআরের নির্ধারিত অনলাইন ব্যবস্থায় নিবন্ধন করে রিটার্ন দাখিল করতে পারেন। এর জন্য সরকারি NBR e-Return পোর্টাল ব্যবহার করা যায়।
রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে নিজের TIN, জাতীয় পরিচয়পত্র, আয়সংক্রান্ত তথ্য, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্পদ ও দায়ের বিবরণ এবং আগে পরিশোধিত করের তথ্য প্রস্তুত রাখা উচিত। অনলাইনে ফরম পূরণের সময় সংশ্লিষ্ট করবর্ষ ও আয়বর্ষ সঠিকভাবে নির্বাচন করতে হবে।
সব তথ্য পূরণের পর আয়, করযোগ্য আয়, উৎসে কর কর্তন, বিনিয়োগ এবং অন্যান্য বিবরণ যাচাই করে রিটার্ন জমা দিতে হবে। রিটার্ন সফলভাবে জমা হলে প্রাপ্তিস্বীকারপত্র বা Acknowledgement Slip এবং সংশ্লিষ্ট কর সনদ সংরক্ষণ করা উচিত।
বাধ্যতামূলক রিটার্নের শ্রেণি, করমুক্ত সীমা ও ব্যতিক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এনবিআরের আয়করসংক্রান্ত সরকারি FAQ দেখা যেতে পারে।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
১. আমার আয় মাসে ৩০ হাজার টাকার কম। আমাকে কি রিটার্ন দিতে হবে?
শুধু মাসিক আয় দিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। আপনার বার্ষিক মোট আয়, পেশা, আগের বছরের কর-সংক্রান্ত ইতিহাস এবং রিটার্নের প্রমাণ প্রয়োজন এমন কোনো সেবা গ্রহণের বিষয় বিবেচনা করতে হবে।
২. আমার TIN আছে, কিন্তু কোনো আয় নেই। রিটার্ন দিতে হবে?
আয় না থাকলেও নির্দিষ্ট আইনগত শর্তে রিটার্ন দিতে হতে পারে। আপনার TIN থাকার কারণ, আগের রিটার্নের ইতিহাস এবং অন্য কোনো বাধ্যতামূলক শর্ত প্রযোজ্য কি না, তা যাচাই করতে হবে।
৩. করমুক্ত সীমার নিচে আয় হলে কি রিটার্ন দিতে হয় না?
সব ক্ষেত্রে এমন নয়। করমুক্ত সীমার নিচে আয় থাকলেও নির্দিষ্ট পেশা, পূর্ববর্তী কর নির্ধারণ বা সেবা গ্রহণের শর্তের কারণে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হতে পারে।
৪. বেসরকারি চাকরিজীবীদের কি সবাই রিটার্ন দেবেন?
সবাই একই নিয়মের আওতায় পড়েন না। তবে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী বা ব্যবস্থাপনা পদে বেতনভোগী কর্মীদের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। ব্যক্তির প্রকৃত পদ ও প্রযোজ্য আইন যাচাই করতে হবে।
৫. অনলাইনে রিটার্ন দিতে ছাড় পেলে কি রিটার্ন দিতে হবে না?
না, এই দুই বিষয় এক নয়। অনলাইনে রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় পাওয়া মানেই মূল রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় পাওয়া নয়।
৬. আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে কি জরিমানা হবে?
রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হলে তা না দেওয়ার জন্য প্রযোজ্য আইনে জরিমানা বা অন্যান্য ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে কোন ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে, তা ব্যক্তির পরিস্থিতি ও আইনের সংশ্লিষ্ট বিধানের ওপর নির্ভর করে।
৭. TIN বন্ধ করতে চাইলে কী করব?
নিজে থেকে TIN বাতিল হয়েছে বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। আপনার পরিস্থিতিতে বাতিল বা নিষ্ক্রিয় করার সুযোগ আছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কাছে যাচাই করতে হবে।
উপসংহার
২০২৬–২৭ করবর্ষে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক কি না, তা নির্ধারণ করতে শুধু আয় বা TIN-এর দিকে তাকালেই হবে না। করদাতার বার্ষিক আয়, পেশা, পূর্ববর্তী কর-সংক্রান্ত ইতিহাস এবং নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে রিটার্নের প্রমাণ প্রয়োজন কি না—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।
বিশেষ করে আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলে বা TIN থাকা সত্ত্বেও আয় না থাকলে নিজের ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যতামূলক শর্ত প্রযোজ্য কি না, তা যাচাই করা জরুরি। একইভাবে অনলাইন রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় পাওয়া ব্যক্তিদেরও মূল রিটার্ন দাখিলের প্রয়োজনীয়তা আলাদাভাবে দেখতে হবে।
করদাতাদের উচিত সংশ্লিষ্ট করবর্ষের সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং প্রয়োজন হলে কর কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া। এতে ভুল সিদ্ধান্ত, অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও সম্ভাব্য জরিমানা এড়ানো সহজ হবে।