ঘর থেকে বের হওয়ার আগে যে দোয়াটি পড়তে ভুলবেন না
ধর্ম · 2026-10-30T01:45:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
ঘর থেকে বের হওয়ার আগে আল্লাহর ওপর ভরসা প্রকাশ করে একটি বিশেষ দোয়া পড়ার শিক্ষা দিয়েছেন মহানবী (সা.)। জামে আত-তিরমিজিতে বর্ণিত এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে হেদায়াত, সাহায্য ও সুরক্ষা প্রার্থনা করা হয়। জেনে নিন দোয়াটির আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের সূত্র।
প্রতিদিন সকালে কিংবা যেকোনো প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে আমরা নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কেউ কর্মস্থলে যান, কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে বের হন, আবার কেউ পড়াশোনা কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে যান। কিন্তু ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর ওপর ভরসা করার কথা অনেকেই ভুলে যান। অথচ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ঘর থেকে বের হওয়ার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া পড়ার শিক্ষা দিয়েছেন, যা হাদিসে বর্ণিত রয়েছে।
ইসলামে জীবনের প্রতিটি কাজ আল্লাহর নামে শুরু করা এবং তাঁর ওপর ভরসা রাখার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পড়ার এই দোয়ায় রয়েছে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া, তাঁর ওপর নির্ভরতা প্রকাশ এবং নিজের শক্তি ও সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার শিক্ষা। দোয়াটি ছোট হওয়ায় সহজেই মুখস্থ করা যায় এবং প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করা সম্ভব।
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় যদি বলে, ‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’, তাহলে তাকে বলা হয়, তুমি হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছ, তোমার জন্য যথেষ্ট করা হয়েছে এবং তোমাকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। আর শয়তান তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। বর্ণনাটি জামে আত-তিরমিজির ৩৪২৬ নম্বর হাদিসে রয়েছে। ইমাম তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান সহিহ গরিব বলেছেন।
ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়াটির আরবি পাঠ হলো, بِسْمِ اللَّهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ। বাংলা উচ্চারণ, “বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।” এর বাংলা অর্থ, আল্লাহর নামে বের হচ্ছি, আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি বা সামর্থ্য নেই।
দোয়াটির প্রতিটি বাক্যের মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি শিক্ষা। ‘বিসমিল্লাহ’ বলার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নাম স্মরণ করে নিজের কাজ শুরু করেন। ‘তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ’ বলার মাধ্যমে নিজের কাজের ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভরতার কথা প্রকাশ করেন। আর ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বাক্যটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত শক্তি ও সামর্থ্যের মালিক আল্লাহ তাআলা। মানুষের চেষ্টা থাকলেও তাঁর সাহায্য ছাড়া কোনো কিছুই পূর্ণতা পায় না।
এই দোয়ার মাধ্যমে একজন মুসলমান শুধু নিজের নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করেন না, বরং জীবনের প্রতিটি কাজে আল্লাহর ওপর নির্ভর করার মানসিকতাও গড়ে তোলেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, দোয়াটি পাঠকারী ব্যক্তির জন্য হেদায়াত, যথেষ্টতা ও সুরক্ষার সুসংবাদ রয়েছে এবং শয়তান তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। এটি দোয়াটির বিশেষ মর্যাদা তুলে ধরে। তবে এর অর্থ এই নয় যে দোয়া পড়লে মানুষকে আর কোনো সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে না। বরং ইসলাম আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের শিক্ষাও দেয়।
ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আরেকটি বিস্তৃত দোয়াও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। হজরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলতেন, “বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ। আল্লাহুম্মা ইন্না নাউযু বিকা মিন আন নাযিল্লা আও নুদাল্লা, আও নাযলিমা আও নুযলাম, আও নাজহালা আও ইউজহালা আলাইনা।” এর অর্থ, আল্লাহর নামে বের হচ্ছি, আল্লাহর ওপর ভরসা করছি। হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে আশ্রয় চাই, যেন আমরা নিজেরা পথভ্রষ্ট না হই বা অন্যকে পথভ্রষ্ট না করি, কাউকে জুলুম না করি বা নিজেরা জুলুমের শিকার না হই এবং কারও সঙ্গে মূর্খতাপূর্ণ আচরণ না করি বা অন্যের মূর্খতাপূর্ণ আচরণের শিকার না হই। এ বর্ণনাটি জামে আত-তিরমিজির ৩৪২৭ নম্বর হাদিসে পাওয়া যায়।
দোয়া পড়ার জন্য আলাদা কোনো দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কিংবা বাইরে যাওয়ার মুহূর্তে দোয়াটি পড়া যায়। যারা আরবি পড়তে পারেন না, তাঁরা প্রথমে বাংলা উচ্চারণের সাহায্যে মুখস্থ করতে পারেন। তবে বাংলা উচ্চারণ শেখার সহায়ক মাত্র; আরবি শব্দের সঠিক উচ্চারণ শেখার চেষ্টা করাও জরুরি।
পরিবারের শিশুদেরও ছোটবেলা থেকে ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া শেখানো যেতে পারে। বাবা-মা নিজেরা নিয়মিত দোয়াটি পড়লে শিশুরাও তা দেখে শিখতে পারে। এভাবে প্রতিদিনের সাধারণ একটি কাজের মধ্য দিয়েও পরিবারে ইসলামি শিক্ষা ও আল্লাহর ওপর ভরসা করার অভ্যাস তৈরি করা সম্ভব।
তাই কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে মহানবী (সা.)-এর শেখানো এই দোয়াটি পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিজের কাজ শুরু করুন এবং চলার পথে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করুন। ছোট এই আমলটি প্রতিদিনের জীবনে আল্লাহকে স্মরণ করার একটি সুন্দর মাধ্যম হতে পারে।