শ্রীমঙ্গলের সময়

জুমার খুতবা চলার সময় কথা বললে কী হয়?

ধর্ম · 2026-10-30T01:31:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

জুমার খুতবা চলাকালে কথা বলা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে অন্যকে চুপ করতে বলাকেও অনর্থক কাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই খুতবার সময় নীরব থাকা, মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং মোবাইল ফোনসহ অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসল্লির কর্তব্য।

জুমার দিন মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এ দিনের অন্যতম প্রধান ইবাদত হলো জুমার নামাজ। আর জুমার নামাজের আগে ইমাম যখন খুতবা দেন, তখন মুসল্লিদের মনোযোগ দিয়ে তা শোনা এবং নীরব থাকা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, খুতবা চলাকালে কেউ পাশের ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন, মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন কিংবা অন্যকে কথা বলতে নিষেধ করেন। অথচ খুতবা চলার সময় কথা বলা সম্পর্কে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

সহিহ হাদিসে এসেছে, জুমার খুতবা চলার সময় কেউ যদি তার পাশের ব্যক্তিকে চুপ থাকতে বলে, তাহলেও সে অনর্থক কথা বলার কাজ করল। অর্থাৎ অন্যকে নীরব হতে বলার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। তাহলে খুতবা চলার সময় কথা বললে কী হয়? এ বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা কী?

খুতবা চলার সময় কথা বলার ব্যাপারে হাদিসের সতর্কবার্তা

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

«إِذَا قُلْتَ لِصَاحِبِكَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَنْصِتْ وَالْإِمَامُ يَخْطُبُ فَقَدْ لَغَوْتَ»

অর্থ: “জুমার দিন ইমাম যখন খুতবা দিচ্ছেন, তখন তুমি যদি তোমার সঙ্গীকে বলো, ‘চুপ করো’, তাহলেও তুমি অনর্থক কাজ করলে।”

—সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫১।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, খুতবা চলাকালে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি অন্যকে চুপ থাকতে বলার মতো কাজও তখন অনর্থক হিসেবে গণ্য হয়েছে।

খুতবা চলাকালে কথা বললে কি জুমার সওয়াব কমে যায়?

হাদিসে ব্যবহৃত ‘লাগও’ শব্দের অর্থ অনর্থক বা অপ্রয়োজনীয় কাজ ও কথা। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় মুসল্লিদের উচিত মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা। এ সময় গল্প করা, পাশের ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা কিংবা অন্য কোনো অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত থাকা খুতবার আদবের পরিপন্থী।

অনেকেই মনে করেন, শুধু কথা বললেই হয়তো সমস্যা নেই, কিন্তু অন্যকে কথা বলা থেকে বিরত রাখতে বাধা দিলে কোনো অসুবিধা হবে না। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে এই ধারণারও সংশোধন রয়েছে। খুতবা চলাকালে কাউকে ‘চুপ করো’ বলার পরিবর্তে আগে থেকেই সবাইকে নীরব থাকার বিষয়ে সচেতন করা উত্তম।

খুতবা চলার সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে কি?

বর্তমান সময়ে মসজিদে অনেক মুসল্লি খুতবা চলাকালে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। কেউ মেসেজ পড়েন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখেন, আবার কেউ ফোনে কথা বলেন। এসব কাজ খুতবার প্রতি মনোযোগ নষ্ট করে এবং ইবাদতের পরিবেশে বিঘ্ন সৃষ্টি করে।

তাই জুমার নামাজে যাওয়ার আগেই মোবাইল ফোন নীরব বা সাইলেন্ট মোডে রাখা উচিত। খুতবা চলাকালে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ফোন ব্যবহার, ছবি তোলা, ভিডিও করা কিংবা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকা থেকে বিরত থাকা জরুরি।

খুতবা চলাকালে মুসল্লিদের করণীয় কী?

জুমার খুতবা শুরু হওয়ার আগেই মসজিদে উপস্থিত হওয়া, যথাসম্ভব সামনের কাতারে বসা এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনার প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। ইমাম খুতবা শুরু করলে নীরব থাকতে হবে। এ সময় কথা বলা, হাসাহাসি, অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া কিংবা অন্যের মনোযোগ নষ্ট হয় এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

খুতবার মধ্যে ইমাম কোনো বিষয় বললে তার জবাবে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা না বলে মনোযোগ দিয়ে শোনা উত্তম। খুতবা চলাকালে কাউকে সালামের উত্তর দেওয়া, সালাম দেওয়া কিংবা অন্য কোনো কথোপকথন শুরু করার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে।

খুতবা চলাকালে কথা বললে কি জুমার নামাজ বাতিল হয়ে যায়?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা দরকার। খুতবা চলাকালে কথা বলা নিষিদ্ধ ও গুরুতরভাবে নিরুৎসাহিত হলেও শুধু কথা বলার কারণে জুমার নামাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়—এমন কথা বলা ঠিক নয়। নামাজের শুদ্ধতা এবং খুতবা চলাকালে নীরব থাকার বিধান দুটি আলাদা বিষয়। তবে এ সময় কথা বলার কারণে জুমার বিশেষ সওয়াব ও ফজিলত থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাই একজন সচেতন মুসলমানের উচিত জুমার খুতবাকে সাধারণ আলোচনা হিসেবে না দেখে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা। ইমামের প্রতিটি বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং নিজের আচরণের মাধ্যমে অন্য মুসল্লিদের মনোযোগ নষ্ট না করা।

জুমার দিনের শিক্ষা

জুমার নামাজ শুধু নির্দিষ্ট কয়েক রাকাত নামাজ আদায়ের বিষয় নয়; বরং এটি মুসলমানদের একত্র হওয়া, আল্লাহর স্মরণ এবং দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। তাই খুতবা চলাকালে নীরব থাকা, মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং মসজিদের আদব রক্ষা করা প্রত্যেক মুসল্লির দায়িত্ব।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে যে সতর্কবার্তা এসেছে, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইবাদতের সময় ছোট মনে হওয়া অসতর্কতাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই আগামী জুমা থেকেই খুতবা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বন্ধ করে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনার অভ্যাস গড়ে তুলি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জুমার নামাজ যথাযথভাবে আদায় করার এবং খুতবার আদব রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত