শ্রীমঙ্গলের সময়

হিমালয়ে দুর্যোগের ঝুঁকিতে ৩ লাখের বেশি মানুষ, বাড়ছে অপরিকল্পিত নির্মাণ

বিশ্ব · 2026-11-02T17:16:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

হিমালয় অঞ্চলে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন তিন লাখেরও বেশি মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলে যাওয়া, হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত নির্মাণকাজের ফলে এ অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়ছে। নতুন এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর নেপাল, দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বত এবং ভারতের উত্তরাখণ্ডের কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত বাড়ছে ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণ। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এসব এলাকায় ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামোয় আচ্ছাদিত জমির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। আর হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানি উপচে বন্যার ঝুঁকি রয়েছে, এমন এলাকায় নির্মাণ বেড়েছে প্রায় ৭৮ শতাংশ।

বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত গবেষণাটি যুক্তরাজ্য, নেপাল ও ভারতের নয়জন বিজ্ঞানী করেছেন। তাঁরা হিমালয়ের নদীগুলোর দুই পাশের ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা এবং প্রায় ১ হাজার ৩৬০টি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের আশপাশের অঞ্চল বিশ্লেষণ করেন। গবেষকদের ধারণা, বাস্তবে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ, গবেষণায় হিমালয়ের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে; আশপাশের একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এর আওতায় আসেনি।

গবেষণায় পর্যটন অবকাঠামো, আবাসন, সড়ক ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের দ্রুত সম্প্রসারণের চিত্র উঠে এসেছে। নেপালের পোখরা শহর এর একটি উদাহরণ। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরটির বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সেতি গণ্ডকি নদীর তীরে গড়ে ওঠা পুরোনো ভবনগুলো এখন ঝুঁকিতে রয়েছে। পোখরার মেয়র ধনরাজ আচার্য জানান, কিছু ভবন নদী থেকে মাত্র পাঁচ মিটার দূরে অবস্থিত। নতুন নিয়মে নদী থেকে আরও দূরে ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও পুরোনো স্থাপনাগুলো কোথায় সরানো হবে, তা বড় চ্যালেঞ্জ।

পোখরার উত্তরে অন্নপূর্ণা ট্রেকিং এলাকাতেও নদীর তীরে বসতি ও পর্যটন স্থাপনা বেড়েছে। সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে এসব এলাকার কয়েকটি বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় হোমস্টে ব্যবসায়ী ফুরপা শিরিং লামা জানান, সাধারণত মৌসুমে তাঁর ২০টি কক্ষ পর্যটকে পূর্ণ থাকলেও এবার অতিথি রয়েছেন মাত্র পাঁচটি কক্ষে।

গবেষণার প্রধান লেখক ও লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ সি স্কট ওয়াটসন বলেন, নদী উপত্যকায় জনসংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে উন্নয়ন নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশক ধরে এসব অঞ্চলের দুর্যোগঝুঁকিকে প্রভাবিত করবে।

বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্ব গড়ের তুলনায় হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা প্রায় দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। এতে হিমবাহ ও তুষারাবৃত অঞ্চল দ্রুত গলে যাচ্ছে। ফলে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে ভূমিধস, পাথরধস এবং আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। হিমবাহ গলে হ্রদের আয়তন বাড়ার কারণে একপর্যায়ে পানির অতিরিক্ত চাপে প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে।

নেপালে ১৯৪০ সাল থেকে এ ধরনের প্রায় ৩০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া উঁচু পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টিপাত বাড়ায় ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়ছে। গবেষণায় নদী ও হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানির স্তর থেকে ৫০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা ভবনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে ২৬ আগস্ট রাসুয়া জেলায় বন্যার সময় কোনো কোনো এলাকায় পানির উচ্চতা ৭০ মিটার পর্যন্ত উঠেছিল বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। ফলে গবেষণার হিসাবের বাইরেও অনেক স্থাপনা ঝুঁকিতে থাকতে পারে।

নেপালের বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নির্মাণবিধি যথাযথভাবে প্রয়োগ না করায় ঝুঁকি বাড়ছে। নদীর তীরবর্তী নিচু জমিতে হোটেল, বাজার, সড়ক ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠছে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ সংস্থা রাসুয়া-ভোটেকোশি এলাকায় নদীর তীর থেকে ১৫ মিটারের মধ্যে বসতি স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

ভারতের উত্তরাখণ্ডেও নদীতীরবর্তী নির্মাণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পরিবেশকর্মী অনুপ নওটিয়ালের অভিযোগ, পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম উপেক্ষা করা হচ্ছে। তবে বন্যাপ্রবণ এলাকায় জমির ব্যবহার ও নির্মাণ নিয়ন্ত্রণে ১২ অক্টোবর নতুন নিয়ম অনুমোদন করেছে উত্তরাখণ্ড সরকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে উন্নত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, কঠোর নির্মাণবিধি এবং ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা জরুরি। সংবেদনশীল এ অঞ্চলে ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব না হলেও অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ এলাকায় বসতি গড়ে তোলার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা, সায়েন্টিফিক রিপোর্টস।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত