সাজেকে অবরোধ প্রত্যাহার নিয়ে অনিশ্চয়তা, সমঝোতা নিয়ে দুই পক্ষের দুই দাবি
সারাদেশ · 2026-10-27T10:39:14.000000Z · জেলা প্রতিনিধি
রাঙামাটির সাজেকে টানা পাঁচ দিনের অবরোধ ঘিরে সংকট নিরসনে গঙ্গারাম বাজারে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পরও সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। সরকারি প্রতিনিধিদের দাবি, আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির চারটি বিষয়ে প্রায় সমঝোতা হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, মূল দাবিগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় অবরোধ প্রত্যাহারে ঐকমত্য হয়নি।
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে টানা অবরোধ ঘিরে সংকট নিরসনে বৈঠক হলেও কর্মসূচি প্রত্যাহার নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে গঙ্গারাম বাজারে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির দুই সংসদ সদস্য, দুই জেলা প্রশাসক, দুই জেলার পুলিশ সুপারসহ সরকারি কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈঠকে অবরোধের নেতৃত্বে থাকা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরাও পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। তবে আলোচনা শেষে সমঝোতার অগ্রগতি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দেয়।
বৈঠক শেষে সরকারি প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির চারটি বিষয়ে প্রায় সমঝোতা হয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিরা জানান, তাঁদের মূল দাবিগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি। ফলে কোন দাবিতে কতটা অগ্রগতি হয়েছে এবং অবরোধ স্থগিত বা প্রত্যাহারের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে ২২ অক্টোবরের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি, দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত; উজোবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ এবং সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সেনা ও পুলিশ সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া; সংঘর্ষে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ; জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়া; এবং আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার ও তল্লাশি বন্ধ করা।
দাবিগুলোর কয়েকটি তদন্ত, আইন প্রয়োগ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে মামলা প্রত্যাহার, নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান পরিবর্তন এবং সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার মতো বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আইনি ও নিরাপত্তাগত বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। ২২ অক্টোবরের সংঘর্ষে কারা জড়িত ছিল, কী পরিস্থিতিতে গুলিবর্ষণ হয়েছে এবং কারা আহত হয়েছেন—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
সাজেকে অবরোধের পটভূমিতে রয়েছে ২২ অক্টোবরের সংঘর্ষ। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) প্রকাশিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা স্থানীয়দের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ এবং পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ করেছে। ওই ঘটনায় কয়েক হাজার পর্যটক আটকা পড়েন বলেও জানানো হয়। পুলিশ সুপারের বরাত দিয়ে সেনাবাহিনীর তিন থেকে চারজন এবং পুলিশের দুই সদস্য আহত হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইউপিডিএফ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ঘটনার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দুই পক্ষের বক্তব্যে অমিল থাকায় সংঘর্ষের প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখাও প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
অবরোধের কারণে সাজেকের পর্যটন কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে। আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হয়েছে প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীকে। পরিস্থিতির কারণে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন দুই দফায় সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ১১ অক্টোবর অবরোধ শুরু হয়েছিল; পর্যটকদের উদ্ধারের সুবিধার্থে তা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। পরে আবার কর্মসূচি শুরু হয় এবং দুর্গাপূজা উপলক্ষে কিছুদিনের জন্য স্থগিত রাখার পর ২২ অক্টোবর পুনরায় অবরোধ শুরু হয়।
২৬ অক্টোবরের বৈঠকে সরকারি প্রতিনিধিরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিরা প্রথমে তিন দিন এবং পরে পাঁচ দিন সময় দিতে সম্মত হয়েছিলেন বলেও জানা গেছে। তবে অবরোধ পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার বিষয়ে যে আশ্বাসের কথা বলা হয়েছে, তা নিয়ে বৈঠক-পরবর্তী বক্তব্যে স্পষ্ট ঐকমত্য দেখা যায়নি। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি না পাওয়ায় সমঝোতা হয়নি এবং দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
এদিকে খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে সংবাদ সম্মেলনে সংসদ সদস্যরা আলোচনাকে ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করেন। তাঁদের ভাষ্য, পাঁচ দফা দাবির চারটি বিষয়ে প্রায় সমঝোতা হয়েছে এবং বাকি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলবে। রাত হয়ে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আলোচনা চালানো সম্ভব হয়নি বলেও তাঁরা জানান। বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে হেডম্যান ও কার্বারীদের নিয়ে পৃথক বৈঠক হলেও সেখান থেকে চূড়ান্ত সমাধান আসেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গঙ্গারাম বাজারের বৈঠকে সেনাবাহিনীর কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ২২ অক্টোবরের ঘটনার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে এ বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে বৈঠকে সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি না থাকার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে, সাজেকে অবরোধ প্রত্যাহার নিয়ে সরকারি প্রতিনিধি ও আন্দোলনকারীদের বক্তব্যে অমিল থাকায় সংকটের সমাধান এখনো স্পষ্ট নয়। পাঁচ দফা দাবির কোনগুলোতে সমঝোতা হয়েছে, অবরোধ স্থগিতের শর্ত কী এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ঘোষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আলোচনার ধারাবাহিকতা এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।