শ্রীমঙ্গলের সময়

পুরুষদের জন্য আসছে হরমোনবিহীন জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি

স্বাস্থ্য · 2026-11-02T01:43:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

পুরুষদের জন্য হরমোনবিহীন ও প্রয়োজনমতো সেবনযোগ্য জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি তৈরির গবেষণা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েল কর্নেল মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা। বড়িটি শুক্রাণুর চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় এসএসি উৎসেচকের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার পরিকল্পনায় তৈরি হচ্ছে। গবেষকদের লক্ষ্য, যৌনমিলনের আগে সেবনে কয়েক ঘণ্টার জন্য শুক্রাণুর গতিশীলতা বন্ধ রাখা। তবে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ওষুধটি মানুষের শরীরে পরীক্ষার প্রস্তুতিপর্বে রয়েছে; কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা এখনো প্রমাণিত নয়।

পরিবার পরিকল্পনায় জন্মনিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব এত দিন মূলত নারীদের ওপরই বেশি নির্ভরশীল ছিল। তবে পুরুষদের জন্য নতুন ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি তৈরির গবেষণায় আশার আলো দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা। হরমোনের ওপর নির্ভর না করে শুক্রাণুর চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে পারে—এমন একটি পরীক্ষামূলক বড়ি তৈরি করছেন ওয়েল কর্নেল মেডিসিনের গবেষকরা।

গবেষকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বড়িটি যৌনমিলনের প্রায় ৩০ মিনিট আগে সেবন করতে হবে। এর প্রভাব ছয় থেকে আট ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। এ সময় শুক্রাণু ডিম্বাণুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয় গতিশীলতা হারাবে। ফলে গর্ভধারণের ঝুঁকি কমানোর একটি নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই সময়সীমা ও কার্যকারিতা এখনো মানুষের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েল কর্নেল মেডিসিনের অধ্যাপক জোচেন বাক ও লনি লেভিনের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হচ্ছে। তাঁদের গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো পুরুষের প্রজনন হরমোন বা শুক্রাণু উৎপাদন বন্ধ না করে শুক্রাণুর চলাচল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা তৈরি করা।

গবেষণায় যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি শুক্রাণুর চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ‘সলিউবল অ্যাডেনাইলাইল সাইক্লেজ’ বা এসএসি (sAC) নামের একটি উৎসেচকের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করে। স্বাভাবিক অবস্থায় এই উৎসেচক শুক্রাণুর লেজের নড়াচড়া ও গতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে শুক্রাণু কার্যকরভাবে সাঁতার কাটতে পারে না। ফলে ডিম্বাণু পর্যন্ত পৌঁছানোর সক্ষমতা কমে যায়।

২০২৩ সালে গবেষকরা ‘নেচার কমিউনিকেশনস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এসএসি নিষ্ক্রিয় করার প্রভাব তুলে ধরেন। সেখানে পরীক্ষামূলক যৌগ ব্যবহার করে ইঁদুরের শুক্রাণুর চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করা এবং গর্ভধারণ প্রতিরোধের ফল পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা যায়, ওষুধের প্রভাব নির্দিষ্ট সময় পর কমে যায় এবং পুরুষ ইঁদুরের প্রজননক্ষমতা আবার ফিরে আসে। তবে ওই গবেষণা ছিল প্রাণীর ওপর পরিচালিত প্রাক্‌-ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা; মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা প্রমাণ করে না।

নতুন বড়িটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি প্রতিদিন সেবনের জন্য তৈরি করা হচ্ছে না। গবেষকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনের সময় যৌনমিলনের আগে একটি বড়ি সেবন করলেই সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হবে। এতে দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ সেবন বা শরীরের হরমোনের মাত্রা পরিবর্তনের প্রয়োজন নাও হতে পারে।

গবেষকদের লক্ষ্য, ওষুধটি শুক্রাণু উৎপাদন বন্ধ না করে কেবল তার চলাচল সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। অর্থাৎ পুরুষের টেস্টোস্টেরনসহ প্রধান যৌন হরমোনের ওপর সরাসরি প্রভাব না ফেলে জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা তৈরি করা। তবে মানুষের শরীরে পরীক্ষার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। ওষুধটির নিরাপত্তা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যাচাই করা জরুরি।

২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবর ওয়েল কর্নেল মেডিসিন জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট থেকে গবেষণাটির জন্য চার বছর মেয়াদি ৮২ লাখ ডলারের অনুদান পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এই অর্থ দিয়ে ওষুধটির বিষক্রিয়া, নিরাপত্তা, মুখে সেবনের উপযোগী প্রস্তুতপ্রণালি এবং মানুষের শরীরে পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক কাজ করা হবে।

গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্য হলো সুস্থ পুরুষদের নিয়ে প্রথম ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা ফেজ-১ পরীক্ষা শুরু করা। এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের একটি দলকে পরীক্ষামূলক ওষুধ এবং অন্য দলকে প্লাসিবো দেওয়া হবে। এরপর তাঁদের শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় কি না এবং শুক্রাণুর গতিশীলতায় কী পরিবর্তন আসে, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। ওষুধের প্রভাব শেষ হওয়ার পর শুক্রাণুর স্বাভাবিক চলাচল ফিরে আসে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হবে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওষুধটির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থা থেকে গবেষণা অনুদান পাওয়া মানেই এটি মানুষের ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে, এমন নয়। ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত গবেষণা-তথ্য অনুযায়ী, মানুষের শরীরে পরীক্ষার আগে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও বিষক্রিয়াসংক্রান্ত গবেষণা এখনো বাকি। তাই এটি ইতোমধ্যে মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে পরীক্ষিত বা ৯০ শতাংশ কার্যকর—এমন দাবি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বলা যাচ্ছে না।

পুরুষদের জন্য নতুন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি তৈরির এই উদ্যোগ পরিবার পরিকল্পনায় দায়িত্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বর্তমানে পুরুষদের প্রচলিত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির মধ্যে কনডম ও ভ্যাসেকটমি রয়েছে। এর বাইরে সহজে ব্যবহারযোগ্য, সাময়িক এবং হরমোনবিহীন কোনো বড়ি বাজারে এলে দম্পতিদের সামনে নতুন বিকল্প তৈরি হতে পারে।

তবে গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক হলেও ওষুধটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। মানুষের শরীরে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা প্রমাণ, পরবর্তী ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন—সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই এটি সাধারণ মানুষের ব্যবহারের উপযোগী হতে পারে। ফলে কবে নাগাদ ওষুধটি বাজারে আসবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত